ঢাকা ১২:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপত্তা ছাড়পত্রে আটকে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল

নিজস্ব সংবাদ :

সাবমেরিন কেবল নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান
নিরাপত্তা ছাড়পত্রে আটকে বেসরকারি প্রকল্প—বিটিআরসির সময় বাড়ানোর সুপারিশ, প্রশ্ন লাইসেন্স ও বিদেশি সম্পৃক্ততা নিয়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের উদ্যোগ এখন জটিলতার গভীর আবর্তে। চার বছর আগে তিন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। কাজের সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র, লাইসেন্সের শর্ত এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে সামিট কমিউনিকেশনস, মেটাকোর সাবকম ও সিডিনেট কমিউনিকেশনসকে পৃথক সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ৪৮ মাসের মধ্যে কেবল স্থাপন শেষ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
সামিট ও সিডিনেটের সময়সীমা গত ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে। মেটাকোরের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ১৩ সেপ্টেম্বর। প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চাইলেও বিটিআরসি তিন প্রতিষ্ঠানকেই এক বছর সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
জাহাজ প্রস্তুত, ছাড়পত্রে বাধা
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেবলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মৎস্য ও নৌপরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরের অনুমোদনের কথাও জানা গেছে। কিন্তু পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—প্রকল্প অনুমোদনের চার বছর পরও কেন আন্তঃমন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলো না?
যৌথ উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন
তিন প্রতিষ্ঠান পৃথক লাইসেন্স পেলেও পরবর্তী সময়ে যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
লাইসেন্স দেওয়ার সময় এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় বাড়ছে সতর্কতা
প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদারি কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সরকারের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাবমেরিন কেবল জাতীয় যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ও ঠিকাদারি ভূমিকা নিয়ে নিরাপত্তা যাচাইকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকলে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্যনিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
২৯ জুলাইয়ের চিঠিতে সরকারের বার্তা
গত ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ তাদের অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ছাড়পত্র না দেওয়ার অনুরোধ করেছে বলে জানা গেছে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাবমেরিন কেবল প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সময় বাড়ালেই কি কাটবে জট?
বিটিআরসির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও এক বছর সময় পাবে। কিন্তু নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অনুমোদনের জট খুলতে না পারলে এই অতিরিক্ত সময়ও কার্যত অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন সাবমেরিন কেবল যুক্ত হলে দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগে সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা ও ঝুঁকি কমতে পারে।
তাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও কীভাবে দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দেশের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা যায়।
প্রকল্পটির লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে মালিকানা কাঠামো, যৌথ উদ্যোগ, বিদেশি ঠিকাদারি সম্পৃক্ততা, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং সরকারি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হলে প্রকল্পটি কেন চার বছরেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, তার প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্প তাই এখন শুধু একটি টেলিযোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় নিরাপত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও কৌশলগত স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১১:১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০ বার পড়া হয়েছে

নিরাপত্তা ছাড়পত্রে আটকে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল

আপডেট সময় ১১:১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাবমেরিন কেবল নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান
নিরাপত্তা ছাড়পত্রে আটকে বেসরকারি প্রকল্প—বিটিআরসির সময় বাড়ানোর সুপারিশ, প্রশ্ন লাইসেন্স ও বিদেশি সম্পৃক্ততা নিয়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের উদ্যোগ এখন জটিলতার গভীর আবর্তে। চার বছর আগে তিন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। কাজের সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র, লাইসেন্সের শর্ত এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে সামিট কমিউনিকেশনস, মেটাকোর সাবকম ও সিডিনেট কমিউনিকেশনসকে পৃথক সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ৪৮ মাসের মধ্যে কেবল স্থাপন শেষ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
সামিট ও সিডিনেটের সময়সীমা গত ৩১ আগস্ট শেষ হয়েছে। মেটাকোরের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ১৩ সেপ্টেম্বর। প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চাইলেও বিটিআরসি তিন প্রতিষ্ঠানকেই এক বছর সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
জাহাজ প্রস্তুত, ছাড়পত্রে বাধা
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেবলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মৎস্য ও নৌপরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরের অনুমোদনের কথাও জানা গেছে। কিন্তু পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—প্রকল্প অনুমোদনের চার বছর পরও কেন আন্তঃমন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলো না?
যৌথ উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন
তিন প্রতিষ্ঠান পৃথক লাইসেন্স পেলেও পরবর্তী সময়ে যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
লাইসেন্স দেওয়ার সময় এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় বাড়ছে সতর্কতা
প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদারি কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সরকারের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাবমেরিন কেবল জাতীয় যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ও ঠিকাদারি ভূমিকা নিয়ে নিরাপত্তা যাচাইকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকলে প্রকল্পের প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্যনিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
২৯ জুলাইয়ের চিঠিতে সরকারের বার্তা
গত ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ তাদের অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ছাড়পত্র না দেওয়ার অনুরোধ করেছে বলে জানা গেছে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাবমেরিন কেবল প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সময় বাড়ালেই কি কাটবে জট?
বিটিআরসির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও এক বছর সময় পাবে। কিন্তু নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অনুমোদনের জট খুলতে না পারলে এই অতিরিক্ত সময়ও কার্যত অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন সাবমেরিন কেবল যুক্ত হলে দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগে সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা ও ঝুঁকি কমতে পারে।
তাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও কীভাবে দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দেশের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা যায়।
প্রকল্পটির লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে মালিকানা কাঠামো, যৌথ উদ্যোগ, বিদেশি ঠিকাদারি সম্পৃক্ততা, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং সরকারি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হলে প্রকল্পটি কেন চার বছরেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, তার প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্প তাই এখন শুধু একটি টেলিযোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় নিরাপত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও কৌশলগত স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।