ঢাকা ০৪:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল হরমুজ—ইরানের কৌশলে বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র

রোজখবর ডেস্ক

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে টানা ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

সংঘাতের শুরুতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও পরবর্তীতে তারা কৌশল পরিবর্তন করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। এই পদক্ষেপ দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) উপলব্ধি করেছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন সম্ভব। ফলে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে ওঠে।

ইরানের পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি তিন ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার করে চার্জ আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং বহনকৃত পণ্যের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিক্রিয়া

হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (UNCLOS) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা বেসামরিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তবে ইরানের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, এই প্রণালির নিরাপত্তা ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল—যা আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এমন কোনো শুল্ক আরোপ বা নিয়ন্ত্রণকে সমুদ্রপথে স্বাধীন চলাচলের নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছে।

বিজয়ের বয়ান বনাম বাস্তবতা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যুদ্ধবিরতিকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং এটিকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি-এর মতবাদের সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে সাবেক আইআরজিসি প্রধান মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনী এখনো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।

তবে এই বিজয়ের বয়ানের আড়ালে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। সংঘাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

সম্ভাব্য ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত ও প্রতীকী বিজয় হতে পারে। তবে এর বিপরীতে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও রয়েছে। এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো সদস্য দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একজোট করে ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সামরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০১:৫৩:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
১২ বার পড়া হয়েছে

যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল হরমুজ—ইরানের কৌশলে বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট সময় ০১:৫৩:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে টানা ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

সংঘাতের শুরুতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও পরবর্তীতে তারা কৌশল পরিবর্তন করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। এই পদক্ষেপ দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) উপলব্ধি করেছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত সুবিধা অর্জন সম্ভব। ফলে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে ওঠে।

ইরানের পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি তিন ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার করে চার্জ আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং বহনকৃত পণ্যের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিক্রিয়া

হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (UNCLOS) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা বেসামরিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তবে ইরানের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, এই প্রণালির নিরাপত্তা ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল—যা আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এমন কোনো শুল্ক আরোপ বা নিয়ন্ত্রণকে সমুদ্রপথে স্বাধীন চলাচলের নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছে।

বিজয়ের বয়ান বনাম বাস্তবতা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যুদ্ধবিরতিকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং এটিকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি-এর মতবাদের সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে সাবেক আইআরজিসি প্রধান মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনী এখনো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।

তবে এই বিজয়ের বয়ানের আড়ালে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। সংঘাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

সম্ভাব্য ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত ও প্রতীকী বিজয় হতে পারে। তবে এর বিপরীতে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও রয়েছে। এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো সদস্য দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একজোট করে ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সামরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home2/rojkhobor/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481