ঢাকা ১০:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সত্য বললে শত্রু, মিথ্যা বললে প্রিয়পাত্র! চাটুকারিতা ও নীতিহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে সমাজের বিবেক, কোথায় যাচ্ছে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ?সমাজ যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক ভেবে মেনে নেয়, তখন সৎ মানুষই অপরাধী সাব্যস্ত হয় ।

নিজস্ব সংবাদ :

সত্য বললে শত্রু, মিথ্যা বললে প্রিয়পাত্র! চাটুকারিতা ও স্বার্থপরতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সমাজের বিবেক, প্রশ্নের মুখে মানবিক মূল্যবোধ
সত্যবাদী মানুষ কেন অবহেলিত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই কেন তৈরি হয় শত্রু? মিথ্যা প্রশংসা ও তোষামোদে কেন বাড়ছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—নৈতিকতার সংকটে পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠান, সর্বত্র আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের সময় এখনই
মোঃ রেজাউল করিম নাসির তালুকদার :
একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা শুধু তার অট্টালিকা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে মানুষের নৈতিকতা, সততা, বিবেক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক আচরণের ওপর। কিন্তু বর্তমান সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু প্রবণতা দৃশ্যমান, যা গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মানুষকে। সত্য কথা বললে মানুষ দূরে সরে যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বিরোধিতা শুরু হয়, কারও ভুল ধরিয়ে দিলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অথচ মিথ্যা প্রশংসা, তোষামোদ, স্বার্থের সম্পর্ক এবং মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক কথা বলার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি এমন একটি সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সত্যবাদী হওয়া অপরাধের মতো বিবেচিত হবে, আর মিথ্যা ও চাটুকারিতা হবে সম্মান পাওয়ার সহজ উপায়?এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং সমাজের সামগ্রিক আচরণ, মূল্যবোধ ও বিবেক নিয়ে আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।
সমাজে ভালো মানুষ নেই, এমন কথা বলা যেমন অন্যায়, তেমনি সমাজের নৈতিক সংকটকে অস্বীকার করাও বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার শামিল। এখনো অসংখ্য মানুষ সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি স্বার্থপরতা, প্রতারণা, অসহিষ্ণুতা ও তোষামোদকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা সমাজের সুস্থ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সত্যের পথে হাঁটলেই কেন একা হতে হয়?
সত্য সব সময় মানুষের পছন্দের কথা নয়। বিশেষ করে যখন সত্য কোনো ব্যক্তির ভুল, অনিয়ম, অন্যায় কিংবা স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন সেই সত্য প্রকাশকারী মানুষটি অনেকের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।একজন মানুষ যখন বন্ধুর ভুল ধরিয়ে দেন, তখন বন্ধু তাঁকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন। পরিবারের কেউ ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে তাঁকে অসম্মানকারী মনে করা হয়। কর্মক্ষেত্রে কেউ অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁকে সহযোগিতাহীন বা বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক সংগঠনেও নেতৃত্বের ভুল নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেক সময় প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে অপছন্দের তালিকায় ফেলা হয়।
এভাবে সত্য বলার পরিবেশ সংকুচিত হলে সমাজে আত্মসমালোচনার সুযোগও কমে যায়।
অথচ একটি সুস্থ সমাজে সত্য কথা বলার অধিকার যেমন থাকতে হবে, তেমনি সত্য শুনে নিজের ভুল সংশোধন করার মানসিকতাও থাকতে হবে। সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। বরং যুক্তিসংগত সমালোচনা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।
তবে সত্য বলার নামে কাউকে অপমান করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সত্য প্রকাশ করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, শালীন ভাষায় এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।চাটুকারিতার সংস্কৃতি: যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বড় হয়ে উঠছে কেন?
চাটুকারিতা সমাজের এমন একটি প্রবণতা, যা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মসম্মান ও নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। কেউ যখন কোনো ব্যক্তির পদ, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব দেখে তাঁর সামনে অতিরিক্ত প্রশংসা করেন, অথচ বাস্তবে তাঁর ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না, তখন সেই সম্পর্কের ভিত্তি হয় স্বার্থ, আন্তরিকতা নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং তোষামোদ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রকৃত দক্ষ ও সৎ মানুষ পিছিয়ে পড়েন, আর সুবিধাবাদীরা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান।
একজন দায়িত্বশীল নেতা বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের উচিত তাঁর চারপাশে শুধু প্রশংসাকারীদের নয়, বরং সত্য কথা বলার সাহস রাখেন এমন মানুষদেরও স্থান দেওয়া।যে প্রতিষ্ঠানে সবাই শুধু প্রধানের প্রশংসা করেন, কিন্তু ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কেউ থাকেন না, সেখানে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। একইভাবে যে পরিবারে সন্তান কিংবা সদস্যরা ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন না, সেখানে সুস্থ সম্পর্ক ও পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
মনে রাখতে হবে, সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী সেই ব্যক্তি নন, যিনি সব সময় আপনার প্রশংসা করেন; বরং যিনি আপনার ভুলটি সম্মানের সঙ্গে ধরিয়ে দেন এবং সঠিক পথে চলতে সহযোগিতা করেন।
পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে
একটি শিশুর নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার। শিশু পরিবারের সদস্যদের আচরণ দেখে শেখে। বাবা-মা যদি সত্য কথা বলেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করেন, তাহলে শিশুর মধ্যেও এসব মূল্যবোধ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে।
কিন্তু পরিবারের বড়রা যদি সন্তানের সামনে মিথ্যা বলেন, অন্যকে ছোট করেন, সামান্য স্বার্থের জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেন কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামনে এক ধরনের এবং দুর্বল মানুষের সামনে অন্য ধরনের আচরণ করেন, তাহলে শিশুর কাছে ভুল আচরণও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
শুধু ভালো ফলাফল, উচ্চশিক্ষা, অর্থবিত্ত কিংবা ভালো চাকরি দিয়ে একজন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষিত বলা যায় না। প্রকৃত শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায় মানুষের ব্যবহার, বিবেক, সততা ও দায়িত্বশীলতায়।২০২৪ সালে ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC) যৌথভাবে প্রকাশিত Empowering Students for Just Societies শীর্ষক নির্দেশিকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নৈতিক আচরণ ও দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে মুখোশধারী আচরণের ঝুঁকি
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের বড় মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি মিথ্যা তথ্য, গুজব, অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং লোকদেখানো প্রশংসার প্রবণতাও উদ্বেগের বিষয়।
কেউ ভালো কাজ করলে তাকে উৎসাহিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কাউকে হেয় করা, মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো, ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যের সম্মান নষ্ট করা কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য অসত্য তথ্য প্রচার করা সামাজিক দায়িত্বশীলতার পরিপন্থী।অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রকৃত চরিত্রের চেয়ে বাহ্যিক পরিচিতি বেশি গুরুত্ব পায়। কে কত সুন্দর কথা বলছেন, কার কত অনুসারী, কে কাকে প্রশংসা করছেন—এসবের আড়ালে প্রকৃত কাজ ও দায়িত্ববোধ মূল্যায়নের বিষয়টি হারিয়ে যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে বিচার করার আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ ছাড়া অপপ্রচার চালানো যাবে না। সমালোচনা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ দিয়ে নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিথ্যা ও সামাজিক বিশ্বাসের সংকট
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (BUP) জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত The State of Telling Lies: An Analytical Approach from Bangladesh Perspective শীর্ষক গবেষণায় মিথ্যা বলার পেছনে শাস্তি এড়ানো, সুবিধা অর্জন, সংঘাত থেকে দূরে থাকা এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতির মতো কারণ আলোচিত হয়েছে। গবেষণাটিতে মিথ্যার ফলে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এ গবেষণা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এমন কিছু আচরণকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে?
বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। আবার মিথ্যা, প্রতারণা ও স্বার্থপরতার মাধ্যমে সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়।
সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আচরণ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে।
কোনো সংগঠনের প্রধান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি কখনোই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। নেতৃত্ব মানে শুধু সম্মান গ্রহণ করা নয়; নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব নেওয়া, ভুল স্বীকার করা, সবার মতামত শোনা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা।প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা কিংবা তোষামোদের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক জবাবদিহি এবং নিয়মিত আত্মমূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান
সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আইনের শাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, হয়রানি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে নিয়ে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবে শুধু শাস্তি দিয়ে সমাজের নৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আচরণ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
গণমাধ্যমেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের বিবেক জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো সত্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া।
তবে সাংবাদিকতার নামে ব্যক্তিগত আক্রোশ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, যাচাইবিহীন অভিযোগ কিংবা কারও সম্মানহানি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানুষের মধ্যে সচেতনতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের কাছ থেকে
সমাজ পরিবর্তনের কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ কতজন গ্রহণ করি?
আমরা চাই অন্যরা মিথ্যা না বলুক, অথচ নিজের প্রয়োজনে কখনো কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিই। আমরা চাই অন্যরা আমাদের সম্মান করুক, অথচ নিজেরাই অনেক সময় অন্যের সম্মান রক্ষা করি না। আমরা চাই কেউ আমাদের সঙ্গে প্রতারণা না করুক, অথচ নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকার উপেক্ষা করি।
এই দ্বিমুখী আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের কাছে কয়েকটি অঙ্গীকার করা—
কোনো অবস্থাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলে অন্যের ক্ষতি করব না।
কারও অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্মানহানি করব না।
ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়বিচার বজায় রাখব।
অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করব, কিন্তু মিথ্যা প্রশংসা করব না।ভুল করলে তা স্বীকার করব এবং সংশোধনের চেষ্টা করব।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, তবে আইন ও শালীনতার সীমা বজায় রেখে।
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব এবং অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো গুরুত্ব দেব।
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি বিশেষ বার্তা
মা-বাবার প্রতি আহ্বান: সন্তানকে শুধু বড় চাকরি কিংবা অর্থ উপার্জনের শিক্ষা দেবেন না; তাকে সৎ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিন।
শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, সততা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিন।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান: জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে যোগ্যতা অর্জন করুন। মিথ্যা পরিচয় কিংবা প্রতারণা দিয়ে নয়, নিজের পরিশ্রম দিয়ে পরিচিতি গড়ে তুলুন।সামাজিক নেতাদের প্রতি আহ্বান: মানুষের প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে মানুষের আস্থা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিন। সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করুন।
ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান: মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সততা ও ন্যায্যতার চর্চা করুন। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্জিত অর্থ কখনো প্রকৃত সম্মানের ভিত্তি হতে পারে না।
সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান: অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবেন না, আবার কারও বিরুদ্ধে যাচাইবিহীন অভিযোগও তুলবেন না। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখুন।
উপসংহার: যে সমাজে সত্যের সম্মান নেই, সেখানে বিশ্বাসের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত
একটি সমাজ তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে মানুষ নিরাপদে সত্য কথা বলতে পারে, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ পায়, যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান পায় এবং দুর্বল মানুষও নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে।আমরা এমন সমাজ চাই না, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার অর্থ, পদ কিংবা ক্ষমতা দিয়ে। আমরা এমন সমাজ চাই, যেখানে একজন সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কিংবা সমাজসেবক—প্রত্যেকে তাঁর সততা, কাজ ও মানবিকতার জন্য সম্মান পাবেন।
যে মানুষটি সত্য কথা বলেন, তাঁর কথা শুনুন। যে মানুষটি আপনার ভুল ধরিয়ে দেন, তাঁকে শত্রু ভাববেন না। যে মানুষটি আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাঁকে মূল্যায়ন করুন। আর যে ব্যক্তি আপনার সামনে মিথ্যা প্রশংসা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চান, তাঁর কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিন।
মনে রাখতে হবে, সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রাতারাতি তৈরি হয়নি; তাই এর পরিবর্তনও এক দিনে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা, সুশাসন, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং ব্যক্তিগত সততার চর্চা।সত্য বলার কারণে কেউ যেন একা হয়ে না যান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে কেউ যেন অযথা অপমানিত না হন এবং মিথ্যা প্রশংসা করে কেউ যেন প্রকৃত যোগ্য মানুষকে পেছনে ফেলে দিতে না পারেন—এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
আজ সময় এসেছে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার। অন্যকে পরিবর্তনের উপদেশ দেওয়ার আগে নিজেকে পরিবর্তন করার।
কারণ সমাজের পরিবর্তন কোনো একজন মানুষের হাতে নয়; সমাজের প্রতিটি মানুষের ছোট ছোট সৎ কাজ, দায়িত্বশীল আচরণ ও নৈতিক সিদ্ধান্তের সমষ্টিই একদিন বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।সমাজের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার
মিথ্যা নয়, সত্যের চর্চা হোক।
চাটুকারিতা নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক।
স্বার্থপরতা নয়, মানবিকতার জয় হোক।
প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।
সত্য, সততা ও মানবিকতাই হোক আগামীর সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
৪ বার পড়া হয়েছে

সত্য বললে শত্রু, মিথ্যা বললে প্রিয়পাত্র! চাটুকারিতা ও নীতিহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে সমাজের বিবেক, কোথায় যাচ্ছে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ?সমাজ যখন অন্যায়কে স্বাভাবিক ভেবে মেনে নেয়, তখন সৎ মানুষই অপরাধী সাব্যস্ত হয় ।

আপডেট সময় ১০:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সত্য বললে শত্রু, মিথ্যা বললে প্রিয়পাত্র! চাটুকারিতা ও স্বার্থপরতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সমাজের বিবেক, প্রশ্নের মুখে মানবিক মূল্যবোধ
সত্যবাদী মানুষ কেন অবহেলিত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই কেন তৈরি হয় শত্রু? মিথ্যা প্রশংসা ও তোষামোদে কেন বাড়ছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—নৈতিকতার সংকটে পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠান, সর্বত্র আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের সময় এখনই
মোঃ রেজাউল করিম নাসির তালুকদার :
একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা শুধু তার অট্টালিকা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে মানুষের নৈতিকতা, সততা, বিবেক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক আচরণের ওপর। কিন্তু বর্তমান সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন কিছু প্রবণতা দৃশ্যমান, যা গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মানুষকে। সত্য কথা বললে মানুষ দূরে সরে যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বিরোধিতা শুরু হয়, কারও ভুল ধরিয়ে দিলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অথচ মিথ্যা প্রশংসা, তোষামোদ, স্বার্থের সম্পর্ক এবং মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক কথা বলার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি এমন একটি সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সত্যবাদী হওয়া অপরাধের মতো বিবেচিত হবে, আর মিথ্যা ও চাটুকারিতা হবে সম্মান পাওয়ার সহজ উপায়?এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং সমাজের সামগ্রিক আচরণ, মূল্যবোধ ও বিবেক নিয়ে আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।
সমাজে ভালো মানুষ নেই, এমন কথা বলা যেমন অন্যায়, তেমনি সমাজের নৈতিক সংকটকে অস্বীকার করাও বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার শামিল। এখনো অসংখ্য মানুষ সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জীবনযাপন করছেন। কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি স্বার্থপরতা, প্রতারণা, অসহিষ্ণুতা ও তোষামোদকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা সমাজের সুস্থ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সত্যের পথে হাঁটলেই কেন একা হতে হয়?
সত্য সব সময় মানুষের পছন্দের কথা নয়। বিশেষ করে যখন সত্য কোনো ব্যক্তির ভুল, অনিয়ম, অন্যায় কিংবা স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন সেই সত্য প্রকাশকারী মানুষটি অনেকের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।একজন মানুষ যখন বন্ধুর ভুল ধরিয়ে দেন, তখন বন্ধু তাঁকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন। পরিবারের কেউ ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে তাঁকে অসম্মানকারী মনে করা হয়। কর্মক্ষেত্রে কেউ অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁকে সহযোগিতাহীন বা বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক সংগঠনেও নেতৃত্বের ভুল নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেক সময় প্রশ্নকারী ব্যক্তিকে অপছন্দের তালিকায় ফেলা হয়।
এভাবে সত্য বলার পরিবেশ সংকুচিত হলে সমাজে আত্মসমালোচনার সুযোগও কমে যায়।
অথচ একটি সুস্থ সমাজে সত্য কথা বলার অধিকার যেমন থাকতে হবে, তেমনি সত্য শুনে নিজের ভুল সংশোধন করার মানসিকতাও থাকতে হবে। সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। বরং যুক্তিসংগত সমালোচনা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।
তবে সত্য বলার নামে কাউকে অপমান করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সত্য প্রকাশ করতে হবে দায়িত্বশীলভাবে, শালীন ভাষায় এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।চাটুকারিতার সংস্কৃতি: যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বড় হয়ে উঠছে কেন?
চাটুকারিতা সমাজের এমন একটি প্রবণতা, যা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মসম্মান ও নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। কেউ যখন কোনো ব্যক্তির পদ, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব দেখে তাঁর সামনে অতিরিক্ত প্রশংসা করেন, অথচ বাস্তবে তাঁর ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না, তখন সেই সম্পর্কের ভিত্তি হয় স্বার্থ, আন্তরিকতা নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পরিশ্রমের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং তোষামোদ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রকৃত দক্ষ ও সৎ মানুষ পিছিয়ে পড়েন, আর সুবিধাবাদীরা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান।
একজন দায়িত্বশীল নেতা বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের উচিত তাঁর চারপাশে শুধু প্রশংসাকারীদের নয়, বরং সত্য কথা বলার সাহস রাখেন এমন মানুষদেরও স্থান দেওয়া।যে প্রতিষ্ঠানে সবাই শুধু প্রধানের প্রশংসা করেন, কিন্তু ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কেউ থাকেন না, সেখানে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ কমে যায়। একইভাবে যে পরিবারে সন্তান কিংবা সদস্যরা ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন না, সেখানে সুস্থ সম্পর্ক ও পারস্পরিক বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
মনে রাখতে হবে, সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী সেই ব্যক্তি নন, যিনি সব সময় আপনার প্রশংসা করেন; বরং যিনি আপনার ভুলটি সম্মানের সঙ্গে ধরিয়ে দেন এবং সঠিক পথে চলতে সহযোগিতা করেন।
পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে
একটি শিশুর নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার। শিশু পরিবারের সদস্যদের আচরণ দেখে শেখে। বাবা-মা যদি সত্য কথা বলেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করেন, তাহলে শিশুর মধ্যেও এসব মূল্যবোধ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে।
কিন্তু পরিবারের বড়রা যদি সন্তানের সামনে মিথ্যা বলেন, অন্যকে ছোট করেন, সামান্য স্বার্থের জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেন কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামনে এক ধরনের এবং দুর্বল মানুষের সামনে অন্য ধরনের আচরণ করেন, তাহলে শিশুর কাছে ভুল আচরণও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
শুধু ভালো ফলাফল, উচ্চশিক্ষা, অর্থবিত্ত কিংবা ভালো চাকরি দিয়ে একজন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষিত বলা যায় না। প্রকৃত শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায় মানুষের ব্যবহার, বিবেক, সততা ও দায়িত্বশীলতায়।২০২৪ সালে ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (UNODC) যৌথভাবে প্রকাশিত Empowering Students for Just Societies শীর্ষক নির্দেশিকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নৈতিক আচরণ ও দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাড়ছে মুখোশধারী আচরণের ঝুঁকি
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগের বড় মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি মিথ্যা তথ্য, গুজব, অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং লোকদেখানো প্রশংসার প্রবণতাও উদ্বেগের বিষয়।
কেউ ভালো কাজ করলে তাকে উৎসাহিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কাউকে হেয় করা, মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো, ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যের সম্মান নষ্ট করা কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য অসত্য তথ্য প্রচার করা সামাজিক দায়িত্বশীলতার পরিপন্থী।অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রকৃত চরিত্রের চেয়ে বাহ্যিক পরিচিতি বেশি গুরুত্ব পায়। কে কত সুন্দর কথা বলছেন, কার কত অনুসারী, কে কাকে প্রশংসা করছেন—এসবের আড়ালে প্রকৃত কাজ ও দায়িত্ববোধ মূল্যায়নের বিষয়টি হারিয়ে যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে বিচার করার আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ ছাড়া অপপ্রচার চালানো যাবে না। সমালোচনা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ দিয়ে নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিথ্যা ও সামাজিক বিশ্বাসের সংকট
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (BUP) জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত The State of Telling Lies: An Analytical Approach from Bangladesh Perspective শীর্ষক গবেষণায় মিথ্যা বলার পেছনে শাস্তি এড়ানো, সুবিধা অর্জন, সংঘাত থেকে দূরে থাকা এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতির মতো কারণ আলোচিত হয়েছে। গবেষণাটিতে মিথ্যার ফলে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এ গবেষণা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এমন কিছু আচরণকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে?
বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। আবার মিথ্যা, প্রতারণা ও স্বার্থপরতার মাধ্যমে সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়।
সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আচরণ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে।
কোনো সংগঠনের প্রধান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি কখনোই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। নেতৃত্ব মানে শুধু সম্মান গ্রহণ করা নয়; নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব নেওয়া, ভুল স্বীকার করা, সবার মতামত শোনা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা।প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা কিংবা তোষামোদের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক জবাবদিহি এবং নিয়মিত আত্মমূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান
সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আইনের শাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, হয়রানি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে নিয়ে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবে শুধু শাস্তি দিয়ে সমাজের নৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানুষের চিন্তাভাবনা, আচরণ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
গণমাধ্যমেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের বিবেক জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো সত্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া।
তবে সাংবাদিকতার নামে ব্যক্তিগত আক্রোশ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, যাচাইবিহীন অভিযোগ কিংবা কারও সম্মানহানি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সত্য যাচাইয়ের সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানুষের মধ্যে সচেতনতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের কাছ থেকে
সমাজ পরিবর্তনের কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ কতজন গ্রহণ করি?
আমরা চাই অন্যরা মিথ্যা না বলুক, অথচ নিজের প্রয়োজনে কখনো কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিই। আমরা চাই অন্যরা আমাদের সম্মান করুক, অথচ নিজেরাই অনেক সময় অন্যের সম্মান রক্ষা করি না। আমরা চাই কেউ আমাদের সঙ্গে প্রতারণা না করুক, অথচ নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকার উপেক্ষা করি।
এই দ্বিমুখী আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের কাছে কয়েকটি অঙ্গীকার করা—
কোনো অবস্থাতেই ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলে অন্যের ক্ষতি করব না।
কারও অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্মানহানি করব না।
ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়বিচার বজায় রাখব।
অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করব, কিন্তু মিথ্যা প্রশংসা করব না।ভুল করলে তা স্বীকার করব এবং সংশোধনের চেষ্টা করব।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, তবে আইন ও শালীনতার সীমা বজায় রেখে।
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব এবং অন্যের অধিকারকে নিজের অধিকারের মতো গুরুত্ব দেব।
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি বিশেষ বার্তা
মা-বাবার প্রতি আহ্বান: সন্তানকে শুধু বড় চাকরি কিংবা অর্থ উপার্জনের শিক্ষা দেবেন না; তাকে সৎ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিন।
শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, সততা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিন।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান: জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে যোগ্যতা অর্জন করুন। মিথ্যা পরিচয় কিংবা প্রতারণা দিয়ে নয়, নিজের পরিশ্রম দিয়ে পরিচিতি গড়ে তুলুন।সামাজিক নেতাদের প্রতি আহ্বান: মানুষের প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে মানুষের আস্থা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিন। সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করুন।
ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান: মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সততা ও ন্যায্যতার চর্চা করুন। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্জিত অর্থ কখনো প্রকৃত সম্মানের ভিত্তি হতে পারে না।
সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান: অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবেন না, আবার কারও বিরুদ্ধে যাচাইবিহীন অভিযোগও তুলবেন না। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখুন।
উপসংহার: যে সমাজে সত্যের সম্মান নেই, সেখানে বিশ্বাসের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত
একটি সমাজ তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে মানুষ নিরাপদে সত্য কথা বলতে পারে, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ পায়, যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান পায় এবং দুর্বল মানুষও নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে।আমরা এমন সমাজ চাই না, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার অর্থ, পদ কিংবা ক্ষমতা দিয়ে। আমরা এমন সমাজ চাই, যেখানে একজন সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কিংবা সমাজসেবক—প্রত্যেকে তাঁর সততা, কাজ ও মানবিকতার জন্য সম্মান পাবেন।
যে মানুষটি সত্য কথা বলেন, তাঁর কথা শুনুন। যে মানুষটি আপনার ভুল ধরিয়ে দেন, তাঁকে শত্রু ভাববেন না। যে মানুষটি আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাঁকে মূল্যায়ন করুন। আর যে ব্যক্তি আপনার সামনে মিথ্যা প্রশংসা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চান, তাঁর কথার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিন।
মনে রাখতে হবে, সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রাতারাতি তৈরি হয়নি; তাই এর পরিবর্তনও এক দিনে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা, সুশাসন, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং ব্যক্তিগত সততার চর্চা।সত্য বলার কারণে কেউ যেন একা হয়ে না যান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে কেউ যেন অযথা অপমানিত না হন এবং মিথ্যা প্রশংসা করে কেউ যেন প্রকৃত যোগ্য মানুষকে পেছনে ফেলে দিতে না পারেন—এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
আজ সময় এসেছে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার। অন্যকে পরিবর্তনের উপদেশ দেওয়ার আগে নিজেকে পরিবর্তন করার।
কারণ সমাজের পরিবর্তন কোনো একজন মানুষের হাতে নয়; সমাজের প্রতিটি মানুষের ছোট ছোট সৎ কাজ, দায়িত্বশীল আচরণ ও নৈতিক সিদ্ধান্তের সমষ্টিই একদিন বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।সমাজের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার
মিথ্যা নয়, সত্যের চর্চা হোক।
চাটুকারিতা নয়, যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক।
স্বার্থপরতা নয়, মানবিকতার জয় হোক।
প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।
সত্য, সততা ও মানবিকতাই হোক আগামীর সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।