ঢাকা ০৬:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুধের নামে বিষের বাণিজ্য! জেলি-সয়াবিন তেলে নকল দুধ, বিপন্ন জনস্বাস্থ্য—মানুষ খাবে কী? অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী নিয়মিত অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি; সপ্তাহে অন্তত চার দিন ভেজালবিরোধী অভিযান চান সচেতন নাগরিকরা।

নিজস্ব সংবাদ :

দুধের নামে বিষের বাণিজ্য! জেলি-সয়াবিন তেলে নকল দুধের কারবার, বিপন্ন জনস্বাস্থ্য
শিশুর পুষ্টির খাবারেই প্রতারণার অভিযোগ—লোভের কাছে হার মানছে মানবতা; দেশজুড়ে সপ্তাহে অন্তত চার দিন অভিযান, নকল দুধের উৎপাদন ও সরবরাহ চক্র শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
এক গ্লাস দুধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের বিশ্বাস, সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যৎ এবং মায়ের মমতা। প্রতিদিন অসংখ্য মা-বাবা সন্তানকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর আশায় বাজার থেকে দুধ কিনে আনেন। কিন্তু সেই দুধই যদি জেলি, সয়াবিন তেল ও অন্যান্য অননুমোদিত উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি কোথায় থাকবে? যে খাবার শরীরের পুষ্টি জোগানোর কথা, সেটিই যদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
সম্প্রতি NEWS24-এর বিশেষ প্রতিবেদনে জেলি ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দুধের মতো দেখতে তরল তৈরি করে মানুষের কাছে বিক্রি করার এই অভিযোগ খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্ত, এটি শুধু ভেজাল পণ্য বিক্রির ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর বিষয়।
আজ দেশের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—দুধ কিনেও যদি নিশ্চিন্ত থাকা না যায়, তাহলে নিরাপদ খাবার কোথায়?
অনুসন্ধানে উঠে আসছে ভয়ংকর প্রশ্ন
নকল দুধ তৈরির ঘটনা সামনে আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা। একটি কারখানায় নকল দুধ তৈরি হলে তা কি শুধু স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়, নাকি বিভিন্ন বাজার, দোকান, মিষ্টির কারখানা ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানেও পৌঁছে যায়?
কারা এসব পণ্য সংগ্রহ করেন? কারা পরিবহন করেন? কোথায় কোথায় বিক্রি হয়? উৎপাদিত দুধের প্রকৃত ক্রেতা কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের কাছে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, জব্দ করা নমুনায় কী কী উপাদান রয়েছে এবং সেগুলো মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর। একই সঙ্গে নকল দুধের নামে তৈরি পণ্য কোথায় কোথায় সরবরাহ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন।শুধু কারখানার মালিককে আটক বা জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুরো সরবরাহ চক্র শনাক্ত করতে হবে।
পাবনার ঘটনা: একের পর এক অভিযানে বেরিয়ে আসছে নকল দুধের ভয়াবহ চিত্র
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে উপজেলা প্রশাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) যৌথ অভিযানে একটি বাড়িতে নকল দুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। অভিযানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কেজি জেলি, ২০০ লিটার তেল এবং ৩২০ লিটার প্রস্তুত করা ভেজাল দুধ জব্দ করা হয়। পরে এসব উপকরণ ধ্বংস করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানার মালিক আবুল বাশারকে এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন। তাঁর সহযোগীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে ১০ অক্টোবর পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় পৃথক অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। একটি প্রতিষ্ঠানে দুধে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহারের প্রমাণ এবং অন্যটিতে জেলি, সয়াবিন তেল ও ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির চিত্র উঠে আসে। ওই ঘটনায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা, একটি প্রতিষ্ঠান সাময়িক সিলগালা এবং একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরপর এসব ঘটনা সামনে আসার পর খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য কোথায় কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা।
প্রশাসনের অভিযান প্রশংসনীয়, কিন্তু নিয়মিত নজরদারি কোথায়?
নকল দুধ তৈরির কারখানায় প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই প্রশংসনীয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের প্রতিটি এলাকায় কি এ ধরনের নজরদারি রয়েছে? প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারখানা, বাড়িতে গড়ে ওঠা গোপন উৎপাদনকেন্দ্র কিংবা দুধ সংগ্রহের আড়ালে পরিচালিত অনিয়মিত ব্যবসাগুলো কতটা পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে?
প্রশাসনের কাছে জনস্বার্থে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করছে সচেতন মহল—
দেশের কোথায় কোথায় নকল দুধ উৎপাদনের কারখানা রয়েছে, তার তালিকা তৈরি হয়েছে কি?
জব্দ করা ভেজাল দুধের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল কী?
এসব কারখানায় উৎপাদিত দুধ কোন কোন বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে?
বাজারজাত পণ্য প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
আগেও যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তাদের পুনরায় তদারকি করা হচ্ছে কি?এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
সপ্তাহে চার দিন অভিযান পরিচালনা এখন সময়ের দাবি
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে শুধু বিশেষ দিবস, সংবাদ প্রকাশ কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত তদারকি।
আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সপ্তাহে অন্তত চার দিন খাদ্যে ভেজালবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হোক।
এই অভিযান হতে হবে আকস্মিক, তথ্যভিত্তিক এবং ফলাফলনির্ভর। দুধের পাশাপাশি তেল, ঘি, মসলা, মিষ্টি, শিশুখাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম বেশি, সেসব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।অভিযানে শুধু জরিমানা নয়, অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী মামলা, কারখানা সিলগালা, পণ্য জব্দ এবং আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের উদ্যোগ রয়েছে, এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৩৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালনা এবং ৯ হাজার ৯৮৫টি খাদ্যপ্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারও চালু রয়েছে। পাশাপাশি সদর দপ্তরে একটি এবং মাঠপর্যায়ে ৭২টি ক্ষুদ্র পরীক্ষাগার স্থাপনের তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার ভ্যান চালুর উদ্যোগের কথা সংসদে জানানো হয়েছে।
এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে খাদ্যপণ্যের নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করা এবং অপরাধ শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে শুধু পরীক্ষাগার স্থাপন করলেই হবে না; সেখানে পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম, পরীক্ষার কিট এবং নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।বিচারহীনতার সংস্কৃতি নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে
খাদ্যে ভেজালের অপরাধীরা যদি অর্থ ও প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যায়, তাহলে অভিযান পরিচালনা করেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
যারা জেনেশুনে মানুষের খাবারে অননুমোদিত উপাদান মিশিয়ে নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিচারকদের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন, খাদ্যে ভেজালসংক্রান্ত মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন।
একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে কেউ যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন বা অভিযানের তথ্য আগাম ফাঁস করেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী মহল যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের
একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক কিংবা একজন নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ—সবারই নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁদের সন্তানদেরও নিরাপদ দুধ পান করার অধিকার রয়েছে।
মানুষ বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম যাচাই করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি পণ্যের রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা করার সক্ষমতা সাধারণ ক্রেতার নেই। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর।
ভেজাল দুধের কারণে যদি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তার দায় শুধু ক্রেতার ওপর চাপানো যায় না। উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রত্যেকের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নকল খাদ্য উৎপাদন বা বাজারজাত করার তথ্য পাওয়া গেলে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২১ এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইন ১৬১৫৫-এ অভিযোগ ও সহায়তা চাওয়া যায়।
শেষ কথা: একটি জাতিকে সুস্থ রাখতে হলে খাদ্যকে নিরাপদ করতে হবে
আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। তার শরীর, মেধা ও সুস্থ বিকাশের সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের সম্পর্ক রয়েছে। সেই শিশুর খাবার নিয়ে কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মা নিশ্চিন্তে সন্তানের হাতে এক গ্লাস দুধ তুলে দিতে পারবেন। একজন বাবা বাজার থেকে খাবার কিনে ঘরে ফিরবেন কোনো ভয় ছাড়াই। একজন বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের নিশ্চয়তা পাবেন।
দেশের প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের প্রতি আমাদের আহ্বান—খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন।সপ্তাহে অন্তত চার দিন অভিযান পরিচালনা করুন। নকল দুধের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো চক্র শনাক্ত করুন। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনুন।
মনে রাখতে হবে, অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা করা যায়, কিন্তু মানুষের জীবন বিপন্ন করে মুনাফা অর্জনের অধিকার কারও নেই।
দুধের নামে বিষ নয়, চাই নিরাপদ খাদ্য
মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা বন্ধ হোক—ভেজালমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০১:৫৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
৬ বার পড়া হয়েছে

দুধের নামে বিষের বাণিজ্য! জেলি-সয়াবিন তেলে নকল দুধ, বিপন্ন জনস্বাস্থ্য—মানুষ খাবে কী? অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী নিয়মিত অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি; সপ্তাহে অন্তত চার দিন ভেজালবিরোধী অভিযান চান সচেতন নাগরিকরা।

আপডেট সময় ০১:৫৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

দুধের নামে বিষের বাণিজ্য! জেলি-সয়াবিন তেলে নকল দুধের কারবার, বিপন্ন জনস্বাস্থ্য
শিশুর পুষ্টির খাবারেই প্রতারণার অভিযোগ—লোভের কাছে হার মানছে মানবতা; দেশজুড়ে সপ্তাহে অন্তত চার দিন অভিযান, নকল দুধের উৎপাদন ও সরবরাহ চক্র শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
এক গ্লাস দুধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের বিশ্বাস, সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যৎ এবং মায়ের মমতা। প্রতিদিন অসংখ্য মা-বাবা সন্তানকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর আশায় বাজার থেকে দুধ কিনে আনেন। কিন্তু সেই দুধই যদি জেলি, সয়াবিন তেল ও অন্যান্য অননুমোদিত উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটি কোথায় থাকবে? যে খাবার শরীরের পুষ্টি জোগানোর কথা, সেটিই যদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
সম্প্রতি NEWS24-এর বিশেষ প্রতিবেদনে জেলি ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দুধের মতো দেখতে তরল তৈরি করে মানুষের কাছে বিক্রি করার এই অভিযোগ খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্ত, এটি শুধু ভেজাল পণ্য বিক্রির ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবন, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুতর বিষয়।
আজ দেশের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—দুধ কিনেও যদি নিশ্চিন্ত থাকা না যায়, তাহলে নিরাপদ খাবার কোথায়?
অনুসন্ধানে উঠে আসছে ভয়ংকর প্রশ্ন
নকল দুধ তৈরির ঘটনা সামনে আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা। একটি কারখানায় নকল দুধ তৈরি হলে তা কি শুধু স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়, নাকি বিভিন্ন বাজার, দোকান, মিষ্টির কারখানা ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানেও পৌঁছে যায়?
কারা এসব পণ্য সংগ্রহ করেন? কারা পরিবহন করেন? কোথায় কোথায় বিক্রি হয়? উৎপাদিত দুধের প্রকৃত ক্রেতা কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের কাছে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, জব্দ করা নমুনায় কী কী উপাদান রয়েছে এবং সেগুলো মানবস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর। একই সঙ্গে নকল দুধের নামে তৈরি পণ্য কোথায় কোথায় সরবরাহ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন।শুধু কারখানার মালিককে আটক বা জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুরো সরবরাহ চক্র শনাক্ত করতে হবে।
পাবনার ঘটনা: একের পর এক অভিযানে বেরিয়ে আসছে নকল দুধের ভয়াবহ চিত্র
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে উপজেলা প্রশাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) যৌথ অভিযানে একটি বাড়িতে নকল দুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। অভিযানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কেজি জেলি, ২০০ লিটার তেল এবং ৩২০ লিটার প্রস্তুত করা ভেজাল দুধ জব্দ করা হয়। পরে এসব উপকরণ ধ্বংস করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানার মালিক আবুল বাশারকে এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন। তাঁর সহযোগীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে ১০ অক্টোবর পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় পৃথক অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। একটি প্রতিষ্ঠানে দুধে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহারের প্রমাণ এবং অন্যটিতে জেলি, সয়াবিন তেল ও ব্লেন্ডার মেশিন ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির চিত্র উঠে আসে। ওই ঘটনায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা, একটি প্রতিষ্ঠান সাময়িক সিলগালা এবং একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরপর এসব ঘটনা সামনে আসার পর খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য কোথায় কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা।
প্রশাসনের অভিযান প্রশংসনীয়, কিন্তু নিয়মিত নজরদারি কোথায়?
নকল দুধ তৈরির কারখানায় প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই প্রশংসনীয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের প্রতিটি এলাকায় কি এ ধরনের নজরদারি রয়েছে? প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারখানা, বাড়িতে গড়ে ওঠা গোপন উৎপাদনকেন্দ্র কিংবা দুধ সংগ্রহের আড়ালে পরিচালিত অনিয়মিত ব্যবসাগুলো কতটা পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে?
প্রশাসনের কাছে জনস্বার্থে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করছে সচেতন মহল—
দেশের কোথায় কোথায় নকল দুধ উৎপাদনের কারখানা রয়েছে, তার তালিকা তৈরি হয়েছে কি?
জব্দ করা ভেজাল দুধের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল কী?
এসব কারখানায় উৎপাদিত দুধ কোন কোন বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে?
বাজারজাত পণ্য প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
আগেও যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তাদের পুনরায় তদারকি করা হচ্ছে কি?এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
সপ্তাহে চার দিন অভিযান পরিচালনা এখন সময়ের দাবি
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে শুধু বিশেষ দিবস, সংবাদ প্রকাশ কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত তদারকি।
আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সপ্তাহে অন্তত চার দিন খাদ্যে ভেজালবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হোক।
এই অভিযান হতে হবে আকস্মিক, তথ্যভিত্তিক এবং ফলাফলনির্ভর। দুধের পাশাপাশি তেল, ঘি, মসলা, মিষ্টি, শিশুখাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম বেশি, সেসব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।অভিযানে শুধু জরিমানা নয়, অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী মামলা, কারখানা সিলগালা, পণ্য জব্দ এবং আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের উদ্যোগ রয়েছে, এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৩৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালনা এবং ৯ হাজার ৯৮৫টি খাদ্যপ্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারও চালু রয়েছে। পাশাপাশি সদর দপ্তরে একটি এবং মাঠপর্যায়ে ৭২টি ক্ষুদ্র পরীক্ষাগার স্থাপনের তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার ভ্যান চালুর উদ্যোগের কথা সংসদে জানানো হয়েছে।
এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে খাদ্যপণ্যের নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করা এবং অপরাধ শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে শুধু পরীক্ষাগার স্থাপন করলেই হবে না; সেখানে পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম, পরীক্ষার কিট এবং নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।বিচারহীনতার সংস্কৃতি নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে
খাদ্যে ভেজালের অপরাধীরা যদি অর্থ ও প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যায়, তাহলে অভিযান পরিচালনা করেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
যারা জেনেশুনে মানুষের খাবারে অননুমোদিত উপাদান মিশিয়ে নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিচারকদের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন, খাদ্যে ভেজালসংক্রান্ত মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন।
একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে কেউ যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন বা অভিযানের তথ্য আগাম ফাঁস করেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী মহল যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের
একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক কিংবা একজন নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ—সবারই নিরাপদ খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁদের সন্তানদেরও নিরাপদ দুধ পান করার অধিকার রয়েছে।
মানুষ বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম যাচাই করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি পণ্যের রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা করার সক্ষমতা সাধারণ ক্রেতার নেই। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর।
ভেজাল দুধের কারণে যদি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে তার দায় শুধু ক্রেতার ওপর চাপানো যায় না। উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রত্যেকের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নকল খাদ্য উৎপাদন বা বাজারজাত করার তথ্য পাওয়া গেলে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২১ এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের হটলাইন ১৬১৫৫-এ অভিযোগ ও সহায়তা চাওয়া যায়।
শেষ কথা: একটি জাতিকে সুস্থ রাখতে হলে খাদ্যকে নিরাপদ করতে হবে
আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। তার শরীর, মেধা ও সুস্থ বিকাশের সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের সম্পর্ক রয়েছে। সেই শিশুর খাবার নিয়ে কেউ যদি প্রতারণা করে, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মা নিশ্চিন্তে সন্তানের হাতে এক গ্লাস দুধ তুলে দিতে পারবেন। একজন বাবা বাজার থেকে খাবার কিনে ঘরে ফিরবেন কোনো ভয় ছাড়াই। একজন বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের নিশ্চয়তা পাবেন।
দেশের প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের প্রতি আমাদের আহ্বান—খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন।সপ্তাহে অন্তত চার দিন অভিযান পরিচালনা করুন। নকল দুধের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো চক্র শনাক্ত করুন। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনুন।
মনে রাখতে হবে, অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা করা যায়, কিন্তু মানুষের জীবন বিপন্ন করে মুনাফা অর্জনের অধিকার কারও নেই।
দুধের নামে বিষ নয়, চাই নিরাপদ খাদ্য
মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা বন্ধ হোক—ভেজালমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।