ঢাকা ০৬:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুলদী সেতু প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে সেতুমন্ত্রী

নিজস্ব সংবাদ :

গজারিয়ায় ফুলদী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ: আগামী বছর শুরু হতে পারে ভৌত কাজ, প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে সেতুমন্ত্রী
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ফুলদী নদীর ওপর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। সেতুটি নির্মাণে প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত কার্যক্রম চলতি বছর শুরু হয়েছে এবং আগামী বছর ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের রসুলপুর ফেরিঘাটসংলগ্ন প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা জানান।
সেতুমন্ত্রীর এই পরিদর্শনকে ঘিরে ফুলদী নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতায়াতের দুর্ভোগ কমানো এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নতুন করে সামনে এসেছে। তবে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি, নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গেলে সেতু নির্মাণের অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।প্রকল্প প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন—এখন নজর ভৌত কাজ শুরুর দিকে
প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, একটি প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় বাস্তব অবকাঠামো নির্মাণের কাজ।
তিনি জানান, ফুলদী সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত কার্যক্রম এ বছর শুরু হয়েছে। আগামী বছর ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকল্পটির অগ্রগতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের পরবর্তী ধাপগুলো কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্মাণকাজ বাস্তবে শুরু করা সম্ভব হয় কি না। কারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি অর্থায়ন, নকশা, ভূমি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা, দরপত্র এবং নির্মাণের সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।ফুলদী নদীর ওপর সেতু কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গজারিয়ার যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নদী পারাপারের জন্য ফেরিঘাটের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে যাত্রী, পণ্যবাহী যানবাহন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সময় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, জরুরি রোগী পরিবহন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেতুর নকশা, সংযোগ সড়ক, যান চলাচলের সক্ষমতা এবং আশপাশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপর।
এ কারণে শুধু নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নয়, সেতুটিকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে উন্নত করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা
বৃহস্পতিবারের পরিদর্শনকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন, জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী, পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম পিপিএম, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদুর রহমান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফছা নাদিয়াসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সেতু নির্মাণের স্থান ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পরিদর্শনের পর প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা আরও নির্দিষ্ট ভিত্তি পাবে।মৃত্যুফাঁদ’ ইউটার্ন নিয়ে প্রশ্ন: দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ
ফুলদী সেতু পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক দুর্ঘটনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নের বিষয়েও কথা বলেন সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে একটি দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে অনুসন্ধান করা হয় না। দুর্ঘটনার পর একজন চালককে দায়ী করা হয়, কেউ বলেন গাড়িটি ভালো ছিল না, আবার কেউ বলেন পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিষয়টি আগে যথাযথভাবে সামনে আসেনি।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনাটি কেন ঘটল, তা কি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে?
সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, সড়কের নকশাগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, আলোকস্বল্পতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নের মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, যানবাহনের অবস্থা এবং সড়কের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে কোনো ইউটার্নে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে ওই স্থানের নকশা, দৃশ্যমানতা, যান চলাচলের চাপ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রকৌশলগত পর্যালোচনা ছাড়া শুধু চালককে দায়ী করলে সড়কের নকশা বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।দুর্ঘটনা তদন্তে কী কী বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন?
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় সামনে রাখা যেতে পারে। প্রথমত, দুর্ঘটনাপ্রবণ ইউটার্ন ও সড়ক চিহ্নিত করে সেখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা, ধরন এবং সময়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সড়কের নকশা, বাঁক, দৃশ্যমানতা, যানবাহনের গতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করা দরকার।
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কারণ নির্ধারণ করা উচিত। চতুর্থত, তদন্তে সড়কের নকশাগত বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এসব পদক্ষেপ কার্যকর করা গেলে দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই স্থানে পুনরায় দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।ফুলদী সেতু প্রকল্পে এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ
ফুলদী সেতু নির্মাণের বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পের অনুমোদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় কত, অর্থায়নের ব্যবস্থা কী, সেতুর দৈর্ঘ্য ও নকশা কেমন হবে এবং নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সূচি কী—এসব তথ্য প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক হবে।
পাশাপাশি সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক, যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা এবং নির্মাণকাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এখানে উল্লেখ্য, এসব বিষয়কে প্রকল্পের ঘাটতি বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একটি বড় সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।প্রত্যাশা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সময়মতো কাজ শুরু
গজারিয়ায় ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে প্রকল্পের সুফল পেতে হলে পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পরবর্তী ধাপগুলো সময়মতো সম্পন্ন করা এবং ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরু করা জরুরি।
একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিষয়ে সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তব কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয় কি না, সেটিও নজরে রাখার বিষয়। কারণ, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধু দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণ নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।সব মিলিয়ে, ফুলদী সেতু প্রকল্পের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত পরিকল্পনাকে বাস্তব নির্মাণকাজে রূপ দেওয়া। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রকল্পের অগ্রগতি, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনসাধারণের আস্থা আরও জোরদার হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৬:৫৫:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
২ বার পড়া হয়েছে

ফুলদী সেতু প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে সেতুমন্ত্রী

আপডেট সময় ০৬:৫৫:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

গজারিয়ায় ফুলদী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ: আগামী বছর শুরু হতে পারে ভৌত কাজ, প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে সেতুমন্ত্রী
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ফুলদী নদীর ওপর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। সেতুটি নির্মাণে প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত কার্যক্রম চলতি বছর শুরু হয়েছে এবং আগামী বছর ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের রসুলপুর ফেরিঘাটসংলগ্ন প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা জানান।
সেতুমন্ত্রীর এই পরিদর্শনকে ঘিরে ফুলদী নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতায়াতের দুর্ভোগ কমানো এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নতুন করে সামনে এসেছে। তবে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি, নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গেলে সেতু নির্মাণের অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।প্রকল্প প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন—এখন নজর ভৌত কাজ শুরুর দিকে
প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, একটি প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় বাস্তব অবকাঠামো নির্মাণের কাজ।
তিনি জানান, ফুলদী সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও অনুমোদনসংক্রান্ত কার্যক্রম এ বছর শুরু হয়েছে। আগামী বছর ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকল্পটির অগ্রগতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের পরবর্তী ধাপগুলো কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্মাণকাজ বাস্তবে শুরু করা সম্ভব হয় কি না। কারণ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি অর্থায়ন, নকশা, ভূমি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা, দরপত্র এবং নির্মাণের সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।ফুলদী নদীর ওপর সেতু কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গজারিয়ার যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নদী পারাপারের জন্য ফেরিঘাটের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে যাত্রী, পণ্যবাহী যানবাহন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সময় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, জরুরি রোগী পরিবহন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেতুর নকশা, সংযোগ সড়ক, যান চলাচলের সক্ষমতা এবং আশপাশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপর।
এ কারণে শুধু নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নয়, সেতুটিকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে উন্নত করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা
বৃহস্পতিবারের পরিদর্শনকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন, জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী, পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম পিপিএম, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদুর রহমান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাফছা নাদিয়াসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সেতু নির্মাণের স্থান ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পরিদর্শনের পর প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা আরও নির্দিষ্ট ভিত্তি পাবে।মৃত্যুফাঁদ’ ইউটার্ন নিয়ে প্রশ্ন: দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ
ফুলদী সেতু পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক দুর্ঘটনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নের বিষয়েও কথা বলেন সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে একটি দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে অনুসন্ধান করা হয় না। দুর্ঘটনার পর একজন চালককে দায়ী করা হয়, কেউ বলেন গাড়িটি ভালো ছিল না, আবার কেউ বলেন পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিষয়টি আগে যথাযথভাবে সামনে আসেনি।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনাটি কেন ঘটল, তা কি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে?
সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, সড়কের নকশাগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, আলোকস্বল্পতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নের মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, যানবাহনের অবস্থা এবং সড়কের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে কোনো ইউটার্নে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে ওই স্থানের নকশা, দৃশ্যমানতা, যান চলাচলের চাপ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রকৌশলগত পর্যালোচনা ছাড়া শুধু চালককে দায়ী করলে সড়কের নকশা বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।দুর্ঘটনা তদন্তে কী কী বিষয় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন?
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় সামনে রাখা যেতে পারে। প্রথমত, দুর্ঘটনাপ্রবণ ইউটার্ন ও সড়ক চিহ্নিত করে সেখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা, ধরন এবং সময়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সড়কের নকশা, বাঁক, দৃশ্যমানতা, যানবাহনের গতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করা দরকার।
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কারণ নির্ধারণ করা উচিত। চতুর্থত, তদন্তে সড়কের নকশাগত বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এসব পদক্ষেপ কার্যকর করা গেলে দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই স্থানে পুনরায় দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।ফুলদী সেতু প্রকল্পে এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ
ফুলদী সেতু নির্মাণের বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রকল্পের অনুমোদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় কত, অর্থায়নের ব্যবস্থা কী, সেতুর দৈর্ঘ্য ও নকশা কেমন হবে এবং নির্মাণকাজ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সূচি কী—এসব তথ্য প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক হবে।
পাশাপাশি সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক, যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা এবং নির্মাণকাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এখানে উল্লেখ্য, এসব বিষয়কে প্রকল্পের ঘাটতি বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একটি বড় সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।প্রত্যাশা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সময়মতো কাজ শুরু
গজারিয়ায় ফুলদী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে প্রকল্পের সুফল পেতে হলে পরিকল্পনা ও অনুমোদনের পরবর্তী ধাপগুলো সময়মতো সম্পন্ন করা এবং ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরু করা জরুরি।
একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের বিষয়ে সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তব কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয় কি না, সেটিও নজরে রাখার বিষয়। কারণ, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শুধু দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণ নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।সব মিলিয়ে, ফুলদী সেতু প্রকল্পের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত পরিকল্পনাকে বাস্তব নির্মাণকাজে রূপ দেওয়া। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রকল্পের অগ্রগতি, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনসাধারণের আস্থা আরও জোরদার হবে।