ঢাকা ০৭:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচবারের বিএনপি’র সাবেক এমপি আব্দুল হাই আর নেই

নিজস্ব সংবাদ :

মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে এক অধ্যায়ের অবসান: পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাই আর নেই,মুন্সিগঞ্জের রাজনীতিতে শোকের ছায়া
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার
মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলা, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী ও সাবেক প্যানেল স্পিকার আলহাজ মো. আবদুল হাই (৭৭) আর নেই। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সহকর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় কর্মকাণ্ড, সংসদীয় দায়িত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।মুক্তিযুদ্ধ থেকে সংসদীয় রাজনীতি—দীর্ঘ পথচলার অবসান
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হাই। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। পারিবারিক জীবনে তাঁর স্ত্রী জামিলা খাতুন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তাঁর ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি মুন্সীগঞ্জ শহরের বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন আবদুল হাই। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা, বিএনপির কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ।
পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গড়ে তোলেন রাজনৈতিক অবস্থান
আবদুল হাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংসদীয় যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।তিনি মুন্সীগঞ্জ-৪ (বিলুপ্ত) এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ ও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি ও প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে অষ্টম জাতীয় সংসদে প্যানেল স্পিকার নির্বাচিত হন। এসব দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। সংসদীয় কার্যক্রম, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও আবদুল হাইয়ের পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও আচরণ। সাদামাটা জীবনযাপন, সহজ-সরল বাচনভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার কারণে তিনি দলীয় পরিসরের বাইরেও পরিচিতি অর্জন করেছিলেন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণে উঠে এসেছে।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ একজন নেতার মৃত্যু স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা স্মৃতি ও মূল্যায়নের জন্ম দেয়। আবদুল হাইয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ও আলোচনায় আসছে।তবে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর দায়িত্ব পালন, নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জনসম্পৃক্ততার বিভিন্ন দিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আবদুল হাইয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও সেই বৃহত্তর পর্যালোচনার অংশ।শেষ বিদায়: সংসদ ভবন থেকে মুন্সীগঞ্জ
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। পরে মুন্সীগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হবে।
তাঁর শেষ বিদায়কে ঘিরে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেসব মানুষের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে তাঁর মৃত্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ: একজন নেতার মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন
আবদুল হাইয়ের মৃত্যু শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের জীবনাবসান নয়; এটি মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় ফিরে দেখার উপলক্ষও। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক।
তবে তাঁর মৃত্যুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ, দলীয় সংগঠনের ভবিষ্যৎ এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সংসদীয় ভূমিকা, দলীয় সাংগঠনিক অবদান এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব তথ্য ছাড়া তাঁর রাজনৈতিক অবদান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথাযথ হবে না।
তবে এটুকু স্পষ্ট, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে আবদুল হাই মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে যে শোকের সৃষ্টি হয়েছে, তার পাশাপাশি জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হবে।
মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে আবদুল হাইয়ের দীর্ঘ পথচলা থেমে গেল। রেখে গেলেন মুক্তিযুদ্ধ, সংসদীয় রাজনীতি ও দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ অধ্যায়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৬:৩৯:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
২ বার পড়া হয়েছে

পাঁচবারের বিএনপি’র সাবেক এমপি আব্দুল হাই আর নেই

আপডেট সময় ০৬:৩৯:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে এক অধ্যায়ের অবসান: পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল হাই আর নেই,মুন্সিগঞ্জের রাজনীতিতে শোকের ছায়া
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার
মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলা, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সংসদীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী ও সাবেক প্যানেল স্পিকার আলহাজ মো. আবদুল হাই (৭৭) আর নেই। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সহকর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় কর্মকাণ্ড, সংসদীয় দায়িত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।মুক্তিযুদ্ধ থেকে সংসদীয় রাজনীতি—দীর্ঘ পথচলার অবসান
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হাই। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। পারিবারিক জীবনে তাঁর স্ত্রী জামিলা খাতুন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তাঁর ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি মুন্সীগঞ্জ শহরের বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন আবদুল হাই। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা, বিএনপির কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ।
পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গড়ে তোলেন রাজনৈতিক অবস্থান
আবদুল হাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংসদীয় যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।তিনি মুন্সীগঞ্জ-৪ (বিলুপ্ত) এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদ ও দলীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি ও প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে অষ্টম জাতীয় সংসদে প্যানেল স্পিকার নির্বাচিত হন। এসব দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। সংসদীয় কার্যক্রম, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলেও আবদুল হাইয়ের পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও আচরণ। সাদামাটা জীবনযাপন, সহজ-সরল বাচনভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার কারণে তিনি দলীয় পরিসরের বাইরেও পরিচিতি অর্জন করেছিলেন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণে উঠে এসেছে।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ একজন নেতার মৃত্যু স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা স্মৃতি ও মূল্যায়নের জন্ম দেয়। আবদুল হাইয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিনের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ও আলোচনায় আসছে।তবে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর দায়িত্ব পালন, নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জনসম্পৃক্ততার বিভিন্ন দিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আবদুল হাইয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও সেই বৃহত্তর পর্যালোচনার অংশ।শেষ বিদায়: সংসদ ভবন থেকে মুন্সীগঞ্জ
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। পরে মুন্সীগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হবে।
তাঁর শেষ বিদায়কে ঘিরে পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেসব মানুষের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে তাঁর মৃত্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ: একজন নেতার মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন
আবদুল হাইয়ের মৃত্যু শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের জীবনাবসান নয়; এটি মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় ফিরে দেখার উপলক্ষও। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক।
তবে তাঁর মৃত্যুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রভাব ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ, দলীয় সংগঠনের ভবিষ্যৎ এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সংসদীয় ভূমিকা, দলীয় সাংগঠনিক অবদান এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব তথ্য ছাড়া তাঁর রাজনৈতিক অবদান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথাযথ হবে না।
তবে এটুকু স্পষ্ট, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে আবদুল হাই মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে যে শোকের সৃষ্টি হয়েছে, তার পাশাপাশি জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হবে।
মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে আবদুল হাইয়ের দীর্ঘ পথচলা থেমে গেল। রেখে গেলেন মুক্তিযুদ্ধ, সংসদীয় রাজনীতি ও দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ অধ্যায়।