ঢাকা ০৯:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই আমন্ত্রণ, দুই উদ্দেশ্য: তারেক রহমানকে নিয়ে নয়াদিল্লির ব্যাখ্যা

নিজস্ব সংবাদ :

তারেক রহমানকে ঘিরে ভারতের ‘দুই আমন্ত্রণ’ দাবি
দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস আউটরিচ—আমন্ত্রণের ধরন নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির বক্তব্যে নতুন সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল—একটি ছিল সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য, অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য—এমন দাবি করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আমন্ত্রণসংক্রান্ত বিভ্রান্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণকে সরাসরি ভারত সফরের দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
যে জায়গায় তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি
আমন্ত্রণের বিষয়টি সামনে আসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যদি ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ না থাকে, তাহলে ভারত সফরের বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হবে?
এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি আমন্ত্রণের কথা জানিয়ে বলছে, একটি ছিল দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য।
ফেব্রুয়ারির আমন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণটি ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণের অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বাংলাদেশে এসে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তার স্ত্রী ও সন্তানসহ ভারত সফরের আমন্ত্রণসংবলিত চিঠি পৌঁছে দেন বলে ভারতীয় পক্ষের দাবি।
অর্থাৎ, ভারতের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের ভারত সফরের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যে আমন্ত্রণ দেওয়া হয়, সেটি ছিল আলাদা প্রেক্ষাপটে।
ব্রিকসে বাংলাদেশের অবস্থান
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য বা অংশীদার দেশ নয়। তবে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। সেই কাঠামোর মধ্যেই বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণের বিষয়টি এসেছে।
দ্বিপক্ষীয় সফর বনাম বহুপক্ষীয় মঞ্চ
এখানেই কূটনৈতিকভাবে দুটি আমন্ত্রণের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটি আমন্ত্রণ যদি কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য দেওয়া হয়, সেটি দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণের ভিত্তি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংগঠন বিমসটেকের নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে একই ব্যক্তি দুটি পৃথক পরিচয়ে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ পেতে পারেন—ভারতের বর্তমান বক্তব্যের মূল ব্যাখ্যাটি এখানেই।
বাংলাদেশের বক্তব্যের সঙ্গে কোথায় পার্থক্য?
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ভারতও এখন বলছে, ব্রিকসের আমন্ত্রণটি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে মৌলিক বিরোধ নেই। পার্থক্য তৈরি হয়েছে মূলত দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের পৃথক আমন্ত্রণটি কীভাবে বিবেচনা করা হবে এবং সেটিকে ব্রিকসের আমন্ত্রণের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত করা হবে—তা নিয়ে।
ভারতের নতুন বক্তব্যে তাই আমন্ত্রণের সংখ্যা ও উদ্দেশ্য পৃথক করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রথম ভারত সফর ঘিরে কূটনৈতিক গুরুত্ব
তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের কথা নিশ্চিত করার ফলে ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
তবে সফরের তারিখ, আলোচ্যসূচি কিংবা সফরের রাজনৈতিক ফলাফল সম্পর্কে আমন্ত্রণের তথ্য থেকে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমন্ত্রণ ছিল কি না, তা নয়; বরং কোন আমন্ত্রণ কখন, কোন পরিচয়ে এবং কোন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী—
প্রথম আমন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর;
সময়: ফেব্রুয়ারি;
দ্বিতীয় আমন্ত্রণ: বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশন;
ব্রিকসের আমন্ত্রণের ভিত্তি: বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদ;
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য বা অংশীদার নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আগের বক্তব্যে মূলত ব্রিকসের আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছিল।
তাই প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো—একটি দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের আমন্ত্রণ এবং একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনের আউটরিচ আমন্ত্রণকে একই আমন্ত্রণ হিসেবে দেখার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
কূটনীতিতে বার্তার গুরুত্ব
কূটনীতিতে আমন্ত্রণের ভাষা, সময়, প্রাপক এবং উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর হলে আমন্ত্রণটি কোন পর্যায়ে, কার পক্ষ থেকে এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে—তা দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্য সেই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তারা শুধু ব্রিকসের আমন্ত্রণের ব্যাখ্যা দেয়নি; একই সঙ্গে তারেক রহমানকে আলাদা করে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দেওয়ার দাবিও করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই দ্বিপক্ষীয় সফর কবে হবে এবং সফরটি হলে দুই দেশের আলোচনায় কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাবে। তার উত্তর নির্ভর করবে দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সুতরাং, আমন্ত্রণের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দুই দেশের সরকার এই পৃথক আমন্ত্রণকে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোন পর্যায়ে নিয়ে যায়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৯:২০:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১১ বার পড়া হয়েছে

দুই আমন্ত্রণ, দুই উদ্দেশ্য: তারেক রহমানকে নিয়ে নয়াদিল্লির ব্যাখ্যা

আপডেট সময় ০৯:২০:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারেক রহমানকে ঘিরে ভারতের ‘দুই আমন্ত্রণ’ দাবি
দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস আউটরিচ—আমন্ত্রণের ধরন নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির বক্তব্যে নতুন সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল—একটি ছিল সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য, অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য—এমন দাবি করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আমন্ত্রণসংক্রান্ত বিভ্রান্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, দুটি আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণকে সরাসরি ভারত সফরের দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
যে জায়গায় তৈরি হয়েছিল বিভ্রান্তি
আমন্ত্রণের বিষয়টি সামনে আসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যদি ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ না থাকে, তাহলে ভারত সফরের বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হবে?
এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি আমন্ত্রণের কথা জানিয়ে বলছে, একটি ছিল দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য।
ফেব্রুয়ারির আমন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণটি ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণের অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বাংলাদেশে এসে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তার স্ত্রী ও সন্তানসহ ভারত সফরের আমন্ত্রণসংবলিত চিঠি পৌঁছে দেন বলে ভারতীয় পক্ষের দাবি।
অর্থাৎ, ভারতের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের ভারত সফরের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যে আমন্ত্রণ দেওয়া হয়, সেটি ছিল আলাদা প্রেক্ষাপটে।
ব্রিকসে বাংলাদেশের অবস্থান
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য বা অংশীদার দেশ নয়। তবে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। সেই কাঠামোর মধ্যেই বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণের বিষয়টি এসেছে।
দ্বিপক্ষীয় সফর বনাম বহুপক্ষীয় মঞ্চ
এখানেই কূটনৈতিকভাবে দুটি আমন্ত্রণের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
একটি আমন্ত্রণ যদি কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য দেওয়া হয়, সেটি দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণের ভিত্তি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংগঠন বিমসটেকের নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে একই ব্যক্তি দুটি পৃথক পরিচয়ে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ পেতে পারেন—ভারতের বর্তমান বক্তব্যের মূল ব্যাখ্যাটি এখানেই।
বাংলাদেশের বক্তব্যের সঙ্গে কোথায় পার্থক্য?
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ভারতও এখন বলছে, ব্রিকসের আমন্ত্রণটি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে মৌলিক বিরোধ নেই। পার্থক্য তৈরি হয়েছে মূলত দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের পৃথক আমন্ত্রণটি কীভাবে বিবেচনা করা হবে এবং সেটিকে ব্রিকসের আমন্ত্রণের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত করা হবে—তা নিয়ে।
ভারতের নতুন বক্তব্যে তাই আমন্ত্রণের সংখ্যা ও উদ্দেশ্য পৃথক করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রথম ভারত সফর ঘিরে কূটনৈতিক গুরুত্ব
তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার মতো একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের কথা নিশ্চিত করার ফলে ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
তবে সফরের তারিখ, আলোচ্যসূচি কিংবা সফরের রাজনৈতিক ফলাফল সম্পর্কে আমন্ত্রণের তথ্য থেকে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমন্ত্রণ ছিল কি না, তা নয়; বরং কোন আমন্ত্রণ কখন, কোন পরিচয়ে এবং কোন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী—
প্রথম আমন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর;
সময়: ফেব্রুয়ারি;
দ্বিতীয় আমন্ত্রণ: বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশন;
ব্রিকসের আমন্ত্রণের ভিত্তি: বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদ;
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য বা অংশীদার নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আগের বক্তব্যে মূলত ব্রিকসের আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছিল।
তাই প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো—একটি দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের আমন্ত্রণ এবং একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনের আউটরিচ আমন্ত্রণকে একই আমন্ত্রণ হিসেবে দেখার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
কূটনীতিতে বার্তার গুরুত্ব
কূটনীতিতে আমন্ত্রণের ভাষা, সময়, প্রাপক এবং উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর হলে আমন্ত্রণটি কোন পর্যায়ে, কার পক্ষ থেকে এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে—তা দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বক্তব্য সেই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তারা শুধু ব্রিকসের আমন্ত্রণের ব্যাখ্যা দেয়নি; একই সঙ্গে তারেক রহমানকে আলাদা করে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দেওয়ার দাবিও করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই দ্বিপক্ষীয় সফর কবে হবে এবং সফরটি হলে দুই দেশের আলোচনায় কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাবে। তার উত্তর নির্ভর করবে দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সুতরাং, আমন্ত্রণের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দুই দেশের সরকার এই পৃথক আমন্ত্রণকে ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোন পর্যায়ে নিয়ে যায়।