দক্ষ কর্মী, তিনগুণ রেমিট্যান্সের প্রত্যাশা,জুনায়েদ সাকি
দক্ষ জনবলেই বদলাবে রেমিট্যান্সের চিত্র? চার বছরে তিনগুণ আয়ের লক্ষ্য
সব উপজেলায় টিটিসি, শিক্ষায় প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা—সরকারের বড় পরিকল্পনা; বাস্তবায়ন নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
চার বছরে রেমিট্যান্স তিনগুণ করার উচ্চাভিলাষী সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। সরকারের দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী চার বছরে দেশের রেমিট্যান্স তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। রাজধানীর নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাংলাদেশ ফেয়ারের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ৪.০’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
তবে অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে বড় প্রশ্ন হলো—শুধু দক্ষ জনবল তৈরি করলেই কি রেমিট্যান্স তিনগুণ করা সম্ভব? নাকি এর সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারে প্রবেশ, কর্মীদের মজুরি, অভিবাসন ব্যয়, নিরাপদ কর্মসংস্থান, বৈধ পথে অর্থ পাঠানো এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—সবকিছুর সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন?
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রচলিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শিক্ষাকে দ্রুত কর্মোপযোগী করা সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টিকে থাকার মতো জনবল তৈরিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দুই বছরে সব উপজেলায় টিটিসি—পরিকল্পনা কতটা বাস্তব?
সরকার আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার বা টিটিসি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—শুধু টিটিসি প্রতিষ্ঠা করলেই কি দক্ষ কর্মী তৈরি হবে?
প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ প্রশিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। কতজন প্রশিক্ষণ নিলেন—তার চেয়ে বড় সূচক হওয়া উচিত, কতজন বাস্তবে চাকরি পেলেন এবং কতজন উচ্চ আয়ের কাজে বিদেশে যেতে পারলেন।
কম দক্ষতার শ্রম থেকে উচ্চ আয়ের পেশায় উত্তরণ
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে পাঠালেও উচ্চ দক্ষতার আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দেশের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে একই বিদেশি শ্রমবাজারে কাজ করেও দক্ষতা ও পেশাভেদে আয়ের বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
এখানেই সরকারের নতুন পরিকল্পনার মূল গুরুত্ব। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি কর্মীদের উচ্চ বেতনের কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, ওয়েল্ডিং, কেয়ারগিভিংসহ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
কিন্তু এর জন্য দেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে আগে জানতে হবে—আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বের কোন শ্রমবাজারে কোন দক্ষতার কর্মীর চাহিদা বাড়বে।
রেমিট্যান্স বাড়াতে তিন পক্ষের সমন্বয়
প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা খাত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একাডেমিয়া, ব্যবসা খাত ও সরকার—এই তিন পক্ষকে একসঙ্গে কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে দক্ষতা শেখানো হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় তার চাহিদা ভিন্ন। ফলে পাঠ্যক্রম ও শিল্পখাতের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে দক্ষতা উন্নয়নের প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব এইচআর দুরদানা কবিরও বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন এবং শিক্ষার ব্যবহারিক দিককে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়।
‘আগে কাজ হয়নি তা নয়, তবে কিছু কাজ ছিল ফাঁপা’
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী অতীতের কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, আগে কোনো কাজ হয়নি তা নয়; তবে কিছু কাজ ছিল ‘ফাঁপা’ এবং অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছ।
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সরকারি অর্থে প্রশিক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হলে তার সফলতা শুধু প্রকল্প শেষ হওয়া বা প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে মাপা হলে চলবে না। প্রশিক্ষণের পর কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মীদের অবস্থান—এসবের পরিমাপযোগ্য ফলাফলও প্রকাশ করতে হবে।
শুধু চাকরির জন্য শিক্ষা নয়—মানবিকতাও জরুরি
দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিকতা, ইতিহাস, সমাজ ও সভ্যতার জ্ঞান রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, শুধু করপোরেট উপযোগী মানুষ তৈরি করা মানে যন্ত্র তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মৌলিক গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দক্ষতার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও ভাবতে হবে।
অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু বিদেশে বেশি কর্মী পাঠানো নয়; বরং দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক জনশক্তি তৈরি করা।
তিনগুণ রেমিট্যান্সের পথে বড় বাধা কোথায়?
রেমিট্যান্স তিনগুণ করতে হলে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন প্রয়োজন। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যয় কমানো, দালালচক্র ও অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করতে হবে।
কারণ একজন কর্মী যত দক্ষই হোন, যদি তিনি বিদেশে কাঙ্ক্ষিত মজুরি না পান অথবা অভিবাসন ব্যয়েই বড় অংশ অর্থ হারান, তাহলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন।
শেষ কথা
চার বছরে রেমিট্যান্স তিনগুণ—লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী। কিন্তু দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা যদি বাস্তব শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়, প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা যায় এবং দক্ষ কর্মীদের উচ্চ আয়ের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—পরিকল্পনা কি কাগজে থাকবে, নাকি প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান এবং কর্মসংস্থান থেকে রেমিট্যান্স—পুরো প্রক্রিয়ায় বাস্তব পরিবর্তন আনবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী চার বছরে ঘোষিত সম্ভাবনা বাস্তব অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয় কি না।



















