রংপুরে চার খুন, ৮০ বার ফোন আলাপের রহস্য ঘনীভূত।
রংপুরে একই পরিবারের চার খুন: ৮০ ঘণ্টায় ৮০ ফোন, রহস্যের কেন্দ্রে দুই চাচাতো ভাই
হত্যার আগে-পরে অস্বাভাবিক যোগাযোগের তথ্য পুলিশের হাতে—১৬৪ ধারার জবানবন্দি, সিডিআর ও আলামত মিলিয়ে তদন্তে নতুন মোড়
নিজস্ব প্রতিবেদক | রংপুর
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী ছিল, কারা জড়িত এবং হত্যার আগে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তকারীদের নজরে এসেছে দুই আসামির অস্বাভাবিক ফোনালাপ।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে প্রায় ৮০ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পরস্পরের সঙ্গে মোট ৮০ বার ফোনে কথা বলেছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ঘণ্টায় একবার করে তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। তদন্তকারীদের কাছে এত ঘন ঘন যোগাযোগ স্বাভাবিক মনে হয়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে শুধু ফোনালাপের সংখ্যা দিয়েই কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হয় না। তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এই ৮০টি ফোনকলের সময় কখন, কতক্ষণ কথা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে কলগুলোর কোনো মিল রয়েছে কি না এবং ফোনালাপের প্রকৃত বিষয় কী ছিল।
৮০ ফোনকল—কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পনার অংশ?
মামলার তদন্তে সিডিআর বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সম্পর্কে চাচাতো ভাই। হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে তাদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ছিল।
এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন—হত্যাকাণ্ডের আগে তাদের যোগাযোগের মাত্রা হঠাৎ বেড়েছিল কি না। যদি বেড়ে থাকে, ঠিক কোন সময় থেকে এই যোগাযোগ শুরু হয়েছিল? হত্যার দিন তাদের ফোনের অবস্থান কোন এলাকায় ছিল? তারা কি একই স্থানে ছিলেন, নাকি ভিন্ন জায়গা থেকে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন? ঘটনার পরও কেন এত ঘন ঘন কথা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সিডিআরকে অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু কলের সংখ্যা নয়, কলের সময়, স্থায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনের অবস্থানও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
ঘটনার পরের ফোনালাপও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
তদন্তে শুধু হত্যার আগের যোগাযোগ নয়, ঘটনার পরের যোগাযোগও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ কোনো অপরাধের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন কখনো কখনো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
তবে কোনো ফোনকলের অস্তিত্বমাত্রই অপরাধের প্রমাণ নয়। সেই কথোপকথনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নির্ধারণে পুলিশকে অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
এই জায়গাতেই মামলার তদন্তে ৮০টি ফোনকল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়াবা সেবনের দাবি, কিন্তু ডোপ টেস্টে মাদক শনাক্ত হয়নি
চার খুনের ঘটনায় আরেকটি রহস্য তৈরি হয়েছে আসামিদের মাদক সেবনের দাবি ঘিরে।
পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে বাড়ির ছাদে বসে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশে তাদের ডোপ টেস্ট করা হলে শরীরে কোনো মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে আসামিদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করা হলে প্রতিবেদনে কোনো মাদক শনাক্ত হয়নি।
চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইয়াবায় থাকা অ্যামফিটামিন বা মেথামফেটামিনজাতীয় উপাদান শরীরে নির্দিষ্ট সময়ের পর পরীক্ষায় নাও ধরা পড়তে পারে। ফলে ডোপ টেস্টের ফলাফলকে একা দেখে মাদক সেবনের দাবিকে চূড়ান্তভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা যায় না।
তদন্তে এখন প্রশ্ন—মাদক সেবনের যে দাবি করা হয়েছে, সেটির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না এবং আসামিদের বক্তব্যের অন্য অংশগুলোর সঙ্গে এর সামঞ্জস্য কতটুকু।
রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ
মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল পুলিশ। কিন্তু আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করেন।
আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পরে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম দুই আসামিকে দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।
ফলে তদন্ত এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আদালতে দেওয়া বক্তব্য, সিডিআর এবং অন্যান্য তদন্ত-আলামতের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে বের করাই পুলিশের অন্যতম প্রধান কাজ।
২২ আগস্টের সেই রাত—চার মরদেহে থমকে যায় এলাকা
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি তৈরি হয় আতঙ্ক। কীভাবে একই পরিবারের চারজন প্রাণ হারালেন, কেন তাদের টার্গেট করা হলো এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পরে মামলার তদন্তভার থানা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় পাঁচ প্রশ্ন
এক. হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের যোগাযোগ কেন এত বেড়ে গিয়েছিল?
দুই. ৮০টি ফোনকলের কোনগুলো হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত?
তিন. আসামিদের মোবাইল ফোনের অবস্থান ও অন্যান্য আলামতের সঙ্গে তাদের বক্তব্যের মিল কতটুকু?
চার. ইয়াবা সেবনের দাবির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না?
পাঁচ. ১৬৪ ধারায় দেওয়া বক্তব্য, সিডিআর, ঘটনাস্থলের আলামত ও সাক্ষীদের বক্তব্য—সবগুলো কি একই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করছে?
এই পাঁচ প্রশ্নের উত্তরই হয়তো চার হত্যার রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফোনের হিসাব থেকে হত্যার নেপথ্যে—তদন্তের আসল পরীক্ষা এখন
রংপুরের এই চার হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি হলো ৮০ ঘণ্টায় ৮০ ফোনকল। কিন্তু এই সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কলগুলোর ভেতরের তথ্য এবং ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।
তদন্তকারীদের এখন প্রমাণ করতে হবে—এগুলো নিছক পারিবারিক বা স্বাভাবিক যোগাযোগ ছিল, নাকি হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা বা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
একই সঙ্গে আদালতে দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই, ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ডিজিটাল যোগাযোগ—সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই মামলার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
চারটি প্রাণহানির এই ঘটনায় তাই তদন্তের প্রতিটি সূত্র গুরুত্বপূর্ণ। একটি ফোনকল, একটি সময়, একটি অবস্থান কিংবা একটি বক্তব্য—যেকোনো ছোট তথ্যই বড় রহস্যের দরজা খুলে দিতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায় কার।









