চুলায় গ্যাস নেই, ঘরে বিদ্যুৎ নেই—আশ্বাসে কতটা কমবে মানুষের দুর্ভোগ?
সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাস-বিদ্যুৎ স্বাভাবিকের আশ্বাস, বাস্তবে সংকট কাটাতে কতটা প্রস্তুত সরকার?
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে যখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, তখন সেপ্টেম্বরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামত শেষ হয়েছে এবং সেখানে পুনরায় রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও উন্নত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতির কতটা মিল রয়েছে?
চাহিদা যেখানে প্রায় ৪ হাজার, সরবরাহ সেখানে অর্ধেকের কাছাকাছি
প্রকাশিত তথ্য বলছে, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ ৩০ আগস্ট সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩২২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৭১২ মিলিয়ন ঘনফুট। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে।
অর্থাৎ, সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি পুরোপুরি দূর হবে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এলএনজি সরবরাহেই নতুন অনিশ্চয়তা
গ্যাস সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস এলএনজি সরবরাহ। সংশ্লিষ্ট খাতের খবর অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত একটি এলএনজি কার্গোর নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিকল্পভাবে কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে সেপ্টেম্বরজুড়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এখানেই রিজভীর আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি সামনে আসে। একদিকে বলা হচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে; অন্যদিকে বাজারে পর্যাপ্ত এলএনজি নিশ্চিত করা নিয়ে অনিশ্চয়তার খবর রয়েছে।
গ্যাস সংকট মানেই শুধু চুলার সমস্যা নয়
গ্যাসের সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়ির রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থাও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গ্যাসের ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে বাড়ে লোডশেডিং। এর সঙ্গে কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও অন্যান্য জ্বালানির সংকট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এলএনজি সরবরাহের সমস্যা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, কয়লার মজুতসংকট, ফার্নেস অয়েলের স্বল্পতা এবং কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকা—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কোথায়?
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষায়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে গরমের মধ্যে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইন ক্লাস, কম্পিউটার ব্যবহার, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা রাতের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।
একই সঙ্গে গ্যাস না থাকলে পরিবারের রান্নাবান্না ব্যাহত হয়। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই সংকট একসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্ভোগ দুটোই বাড়ে।
আশ্বাসের পর এখন নজর বাস্তবায়নে
রিজভী বলেছেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি একটি বৈশ্বিক সংকট এবং সরকার সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। তিনি আরও বলেছেন, গ্যাস সংকট সমাধানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নির্ধারিত বাজেটের বাইরে বিপুল অর্থ ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তবে কখন গ্যাসের চাপ বাড়বে, কখন বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং কতটা টেকসইভাবে সংকট মোকাবিলা করা যাবে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহকে লক্ষ্য হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। ফলে এখন সরকারের সামনে মূল পরীক্ষা হলো—ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং লোডশেডিং কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
কারণ সংকটের সময়ে মানুষ শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না; চুলায় গ্যাস, ঘরে বিদ্যুৎ এবং কারখানায় উৎপাদন—এই তিনটির বাস্তব পরিবর্তনই তারা দেখতে চায়।









