দক্ষ তরুণই অর্থনীতির শক্তি, কিন্তু সুযোগ তৈরির দায়িত্ব কার?
দক্ষতা আছে, সুযোগ কোথায়? তরুণদের ভবিষ্যৎ ঘিরে বড় প্রশ্ন—চাকরির বাজারের বাইরে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তোলার কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে। কিন্তু দক্ষতা অর্জনের পর সেই তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং নতুন শিল্পক্ষেত্র কতটা তৈরি হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন সামনে আসছে আরও জোরালোভাবে। শুধু প্রশিক্ষণ ও চাকরিমুখী শিক্ষা দিয়ে কি বিপুলসংখ্যক তরুণের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব?
রাজধানীতে ‘ফ্রম স্কিল টু অপরচুনিটি’ শীর্ষক চাকরি মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যকে জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—শুধু বিদ্যমান চাকরির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করলেই হবে না, একই সঙ্গে নতুন চাকরি ও কর্মসংস্থানের বাজারও তৈরি করতে হবে।
প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান—মাঝখানে বড় ফাঁক
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি চালু রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে একজন তরুণ কোথায় কাজ করবেন, কীভাবে নিজের দক্ষতা কাজে লাগাবেন কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড়াবেন—সেই পথটি সবসময় স্পষ্ট নয়।
ফলে দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রমের সাফল্য শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রশিক্ষণের পর কর্মসংস্থান, আয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার অগ্রগতির বাস্তব ফলাফল।
চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তরুণ প্রয়োজন
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। সবাইকে প্রচলিত সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। এ বাস্তবতায় উদ্যোক্তা তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং নতুন উৎপাদন খাত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
অর্থাৎ দক্ষতা উন্নয়নের ধারণাটিকেও পরিবর্তন করতে হবে। শুধু ‘কীভাবে চাকরি পাওয়া যায়’—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পরিবর্তে ‘কীভাবে একটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করা যায়’—সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
শিল্পনীতি ও দক্ষতার মধ্যে সমন্বয় কতটা?
তথ্যমন্ত্রী পোশাকশিল্পের বিকাশের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, দক্ষ জনশক্তির সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ব্যাংক ঋণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বয় ঘটলে একটি খাত জাতীয় অর্থনীতির বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
এই উদাহরণ বর্তমান সময়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র কোনগুলো হবে, কোন শিল্পে কত জন দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, প্রযুক্তির পরিবর্তনে কোন পেশার চাহিদা বাড়বে—এসব বিবেচনায় নিয়েই দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রযুক্তির যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে বিশ্বের কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে শুধু প্রচলিত ডিগ্রি যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—দুটিই রয়েছে। তরুণদের যদি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা যায় এবং সেই দক্ষতার সঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্পের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে বিশাল যুবশক্তি অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
জাতীয় স্বার্থে ক্যারিয়ার—বার্তার গুরুত্ব এখানেই
তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তরুণদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে যুক্ত করা। ব্যক্তিগত সাফল্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়; তবে একজন দক্ষ তরুণ যদি আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাঁর সাফল্যের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
তাই দক্ষতা উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন প্রশিক্ষিত তরুণ শুধু একটি চাকরি পাবেন না—তিনি নতুন উদ্যোগ নেবেন, নতুন বাজার তৈরি করবেন, অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন এবং দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবেন।
সামনের প্রশ্ন
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কতজন তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তা নয়। প্রশ্ন হলো—তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য কতটা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে? শিল্প ও প্রযুক্তির চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণের সমন্বয় কতটা হচ্ছে? প্রশিক্ষণ শেষে কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন? আর কতজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
তরুণদের হাতে দক্ষতা তুলে দেওয়া প্রথম ধাপ; সেই দক্ষতাকে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হবে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করছে এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র কতটা সঠিক সুযোগ ও দিকনির্দেশনা দিতে পারে তার ওপর।


















