ঢাকা ০৮:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্য খাতে গাফিলতি নয়, দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে চাকরি যাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব সংবাদ :

স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা করলে চাকরি থাকবে না: কঠোর বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্র স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ ও স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিতের ঘোষণা; রোগীদের ভোগান্তি কমাতে কতটা কার্যকর হবে নতুন পদক্ষেপ?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, চিকিৎসাসেবায় গাফিলতি এবং প্রশাসনিক শৈথিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাকরি হারানোর মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত ‘জাতীয় ক্যানসার সম্মেলন ২০২৬’-এর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কঠোর বার্তা দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান, চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা, সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর হুঁশিয়ারি নয়—স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ তদন্ত, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্রুত স্থাপন, সেগুলো পরিচালনায় দক্ষ কর্মী তৈরি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা থেকে চালু করা পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্যানসার রোগীদের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা বন্ধে কঠোর অবস্থান
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে দেশের স্বাস্থ্য খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, সরকারি হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে অবহেলা করার সুযোগ থাকবে না। চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে শৈথিল্য, দায়িত্বহীনতা কিংবা গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে এ অবস্থানের কার্যকারিতা নির্ভর করবে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর। কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যেন একতরফা সিদ্ধান্ত না হয়, আবার প্রমাণিত অনিয়মও যেন প্রভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আড়ালে না থাকে—এ ভারসাম্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, হাসপাতালে গেলে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাওয়া যাবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথাসময়ে হবে এবং জরুরি রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অবহেলা কমাতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা অপরিহার্য।
ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ
ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের ক্যানসার হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রশ্মিচিকিৎসার যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারে রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রের স্বল্পতা, চিকিৎসাসেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দক্ষ জনবলের সীমাবদ্ধতা থাকলে রোগীদের চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হতে পারে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্র স্থাপন এবং সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা সম্ভব হলে রোগীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগী আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন না, তাঁদের জন্য দেশের ভেতরে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু যন্ত্র কেনা বা হাসপাতালে পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়। যন্ত্র স্থাপন, নিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঝুঁকি থাকে।
যন্ত্রপাতি কেনা থেকে চালু করা পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কেন?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনা, স্থাপন ও চালুর প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য স্বাস্থ্য খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের পর সেগুলো রোগীর সেবায় ব্যবহার উপযোগী করতে একাধিক প্রশাসনিক ও কারিগরি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
যন্ত্রপাতির দরপত্র, আমদানি, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া, পরিবহন, হাসপাতালের অবকাঠামো প্রস্তুত, স্থাপন এবং কারিগরি পরীক্ষা—প্রতিটি ধাপেই সময় ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পর্যায়ে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে রোগীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধানযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন হাসপাতালে কী ধরনের যন্ত্র কেনা হয়েছে, সেগুলো কবে পৌঁছেছে, কত দিন পর স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্তমানে কতগুলো যন্ত্র কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, প্রকল্পের নথি ও সরকারি তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র অব্যবহৃত রয়েছে কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে বিলম্ব হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
দক্ষ জনবল তৈরিতে তিন মাসের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা
আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিচালনায় প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির মতো জটিল চিকিৎসা পদ্ধতিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশিক্ষণের মেয়াদ তিন মাস নির্ধারণ করলেই দক্ষতা নিশ্চিত হবে—এমন নয়। প্রশিক্ষণটি কোন প্রতিষ্ঠানে হবে, কারা প্রশিক্ষণ দেবেন, কী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে কীভাবে দক্ষতা যাচাই করা হবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, নার্স, প্রকৌশলী এবং যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বজায় রাখা জরুরি।
বিদেশমুখী চিকিৎসা কমাতে কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অনেক রোগী জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা বিবেচনা করেন। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও আধুনিক চিকিৎসা, নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয় এবং বিশেষায়িত সেবার প্রাপ্যতা রোগী ও তাঁদের পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ভেতরে রশ্মিচিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন নয়, রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যা পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং উপশমমূলক পরিচর্যা। পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা এবং সরকারি হাসপাতালে সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রোগীরা যাতে হাসপাতালভেদে অযথা ঘুরতে না হয়, সে জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। চিকিৎসার মান ও ফলাফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা গেলে রোগীদের আস্থাও বাড়তে পারে।
যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার উদ্যোগ
ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিক সরঞ্জাম দ্রুত আমদানি ও হাসপাতালে স্থাপনের লক্ষ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্দিষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রযোজ্য শুল্কবিধি, আমদানি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন যন্ত্রপাতি সুবিধার আওতায় আসবে, কীভাবে আমদানি করা হবে, প্রকৃত ব্যয় কত এবং সরঞ্জামগুলো নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসাসেবায় ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মান যাচাই এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবার মান কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনবল, অবকাঠামো, ওষুধের সরবরাহ, রোগীর চাপ, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়ন।
কোনো হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও নার্স কম থাকলে, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র অচল থাকলে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি।
জবাবদিহি কার্যকর করতে হাসপাতালভিত্তিক সেবার মান পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত পরিদর্শন এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্বীকৃতি এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ উঠলে রোগী ও তাঁর পরিবার যেন প্রতিকার পাওয়ার বাস্তব সুযোগ পান। অভিযোগের নিষ্পত্তি কত দিনে হচ্ছে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং একই সমস্যা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জাতীয় ক্যানসার সম্মেলনে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
‘সবার জন্য ক্যানসার সেবা: প্রতিরোধ, নির্ভুল চিকিৎসা, উপশমমূলক পরিচর্যা ও নীতিনির্ধারণের সমন্বয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক মোস্তফা আজিজ সুমন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক চিকিৎসক ফারহাদ হালিম ডালিম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক জাহিদ রায়হানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সম্মেলনের আলোচনায় ক্যানসার প্রতিরোধ, নির্ভুল চিকিৎসা, উপশমমূলক পরিচর্যা এবং নীতিনির্ধারণের সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন—এখন নজরদারি জরুরি
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিকায়নের যে পরিকল্পনা উঠে এসেছে, তার বাস্তব ফল নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। রোগীরা কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন, অপেক্ষার সময় কতটা কমছে, যন্ত্রপাতি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং চিকিৎসার ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে—এসব সূচক দিয়ে উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়ন করা সম্ভব।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সেবাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও দূর করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে কঠোর বার্তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আনা। ক্যানসার রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা, হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তবেই এ উদ্যোগের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং তার ফলে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীদের ভোগান্তিতে কতটা পরিবর্তন আসে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১১:৩৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৫ বার পড়া হয়েছে

স্বাস্থ্য খাতে গাফিলতি নয়, দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে চাকরি যাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আপডেট সময় ১১:৩৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা করলে চাকরি থাকবে না: কঠোর বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্র স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ ও স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিতের ঘোষণা; রোগীদের ভোগান্তি কমাতে কতটা কার্যকর হবে নতুন পদক্ষেপ?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, চিকিৎসাসেবায় গাফিলতি এবং প্রশাসনিক শৈথিল্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাকরি হারানোর মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত ‘জাতীয় ক্যানসার সম্মেলন ২০২৬’-এর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কঠোর বার্তা দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান, চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা, সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর হুঁশিয়ারি নয়—স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ তদন্ত, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
একই সঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্রুত স্থাপন, সেগুলো পরিচালনায় দক্ষ কর্মী তৈরি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা থেকে চালু করা পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মন্ত্রী। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্যানসার রোগীদের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে অবহেলা বন্ধে কঠোর অবস্থান
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে দেশের স্বাস্থ্য খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, সরকারি হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে অবহেলা করার সুযোগ থাকবে না। চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে শৈথিল্য, দায়িত্বহীনতা কিংবা গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে এ অবস্থানের কার্যকারিতা নির্ভর করবে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর। কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যেন একতরফা সিদ্ধান্ত না হয়, আবার প্রমাণিত অনিয়মও যেন প্রভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আড়ালে না থাকে—এ ভারসাম্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, হাসপাতালে গেলে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাওয়া যাবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা যথাসময়ে হবে এবং জরুরি রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অবহেলা কমাতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা অপরিহার্য।
ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ
ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের ক্যানসার হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রশ্মিচিকিৎসার যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারে রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রের স্বল্পতা, চিকিৎসাসেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দক্ষ জনবলের সীমাবদ্ধতা থাকলে রোগীদের চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হতে পারে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্র স্থাপন এবং সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা সম্ভব হলে রোগীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগী আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন না, তাঁদের জন্য দেশের ভেতরে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু যন্ত্র কেনা বা হাসপাতালে পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়। যন্ত্র স্থাপন, নিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার ঝুঁকি থাকে।
যন্ত্রপাতি কেনা থেকে চালু করা পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা কেন?
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি কেনা, স্থাপন ও চালুর প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য স্বাস্থ্য খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের পর সেগুলো রোগীর সেবায় ব্যবহার উপযোগী করতে একাধিক প্রশাসনিক ও কারিগরি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
যন্ত্রপাতির দরপত্র, আমদানি, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া, পরিবহন, হাসপাতালের অবকাঠামো প্রস্তুত, স্থাপন এবং কারিগরি পরীক্ষা—প্রতিটি ধাপেই সময় ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পর্যায়ে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে রোগীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধানযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন হাসপাতালে কী ধরনের যন্ত্র কেনা হয়েছে, সেগুলো কবে পৌঁছেছে, কত দিন পর স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্তমানে কতগুলো যন্ত্র কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, প্রকল্পের নথি ও সরকারি তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র অব্যবহৃত রয়েছে কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে বিলম্ব হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
দক্ষ জনবল তৈরিতে তিন মাসের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা
আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিচালনায় প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে রেডিওথেরাপির মতো জটিল চিকিৎসা পদ্ধতিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশিক্ষণের মেয়াদ তিন মাস নির্ধারণ করলেই দক্ষতা নিশ্চিত হবে—এমন নয়। প্রশিক্ষণটি কোন প্রতিষ্ঠানে হবে, কারা প্রশিক্ষণ দেবেন, কী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে কীভাবে দক্ষতা যাচাই করা হবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, নার্স, প্রকৌশলী এবং যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বজায় রাখা জরুরি।
বিদেশমুখী চিকিৎসা কমাতে কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অনেক রোগী জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা বিবেচনা করেন। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও আধুনিক চিকিৎসা, নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয় এবং বিশেষায়িত সেবার প্রাপ্যতা রোগী ও তাঁদের পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ভেতরে রশ্মিচিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন নয়, রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যা পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং উপশমমূলক পরিচর্যা। পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা এবং সরকারি হাসপাতালে সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রোগীরা যাতে হাসপাতালভেদে অযথা ঘুরতে না হয়, সে জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। চিকিৎসার মান ও ফলাফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা গেলে রোগীদের আস্থাও বাড়তে পারে।
যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার উদ্যোগ
ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিক সরঞ্জাম দ্রুত আমদানি ও হাসপাতালে স্থাপনের লক্ষ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্দিষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধা কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রযোজ্য শুল্কবিধি, আমদানি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন যন্ত্রপাতি সুবিধার আওতায় আসবে, কীভাবে আমদানি করা হবে, প্রকৃত ব্যয় কত এবং সরঞ্জামগুলো নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসাসেবায় ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মান যাচাই এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসাসেবার মান কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনবল, অবকাঠামো, ওষুধের সরবরাহ, রোগীর চাপ, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়ন।
কোনো হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও নার্স কম থাকলে, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র অচল থাকলে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি।
জবাবদিহি কার্যকর করতে হাসপাতালভিত্তিক সেবার মান পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত পরিদর্শন এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের স্বীকৃতি এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ উঠলে রোগী ও তাঁর পরিবার যেন প্রতিকার পাওয়ার বাস্তব সুযোগ পান। অভিযোগের নিষ্পত্তি কত দিনে হচ্ছে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং একই সমস্যা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জাতীয় ক্যানসার সম্মেলনে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা
‘সবার জন্য ক্যানসার সেবা: প্রতিরোধ, নির্ভুল চিকিৎসা, উপশমমূলক পরিচর্যা ও নীতিনির্ধারণের সমন্বয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক মোস্তফা আজিজ সুমন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক চিকিৎসক ফারহাদ হালিম ডালিম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক জাহিদ রায়হানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সম্মেলনের আলোচনায় ক্যানসার প্রতিরোধ, নির্ভুল চিকিৎসা, উপশমমূলক পরিচর্যা এবং নীতিনির্ধারণের সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন—এখন নজরদারি জরুরি
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্বাস্থ্য খাতে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা এবং ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিকায়নের যে পরিকল্পনা উঠে এসেছে, তার বাস্তব ফল নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। রোগীরা কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন, অপেক্ষার সময় কতটা কমছে, যন্ত্রপাতি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং চিকিৎসার ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে—এসব সূচক দিয়ে উদ্যোগের সাফল্য মূল্যায়ন করা সম্ভব।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে অবহেলার অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সেবাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও দূর করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে কঠোর বার্তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আনা। ক্যানসার রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা, হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তবেই এ উদ্যোগের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং তার ফলে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীদের ভোগান্তিতে কতটা পরিবর্তন আসে।